বাংলার পরিত্যক্ত বাড়ি — রাত নামলেই বদলে যায় সবকিছু
বাংলার পরিত্যক্ত বাড়ি — রাত নামলেই বদলে যায় সবকিছু
পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রত্যন্ত জেলার নাম সরকারি মানচিত্রে আছে, কিন্তু সেই জেলার এক ছোট্ট গ্রামের নাম যেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। গ্রামের শেষ প্রান্তে, ঘন শালবনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি বিশাল পুরনো বাড়ি।স্থানীয়রা সেটিকে বলত—“মজুমদার বাড়ি।”দিনের আলোয় বাড়িটিকে দেখে ভয় পাওয়ার মতো কিছু ছিল না।ভাঙা বারান্দা, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল, জানালার কাচ ভাঙা, ছাদ থেকে ঝুলে থাকা বটগাছের শিকড়—এই পর্যন্তই।কিন্তু গ্রামের মানুষ একটা ব্যাপারে একমত ছিল।সূর্য ডোবার পর ওই বাড়ির কাছে কেউ যেত না।কারণ রাত নামার পর বাড়িটা আর একই বাড়ি থাকে না।
১. বাড়িটা বদলে যায়
আমি রুদ্রনীল।পেশায় documentary filmmaker।ভূতের গল্পে আমার খুব একটা বিশ্বাস ছিল না। বরং যেসব জায়গাকে মানুষ “ভুতুড়ে” বলে এড়িয়ে চলে, সেসব জায়গার পেছনে আসল কারণ খুঁজে বের করাই ছিল আমার কাজ।মজুমদার বাড়ির কথা প্রথম শুনি গ্রামের এক চায়ের দোকানে।দোকানের বৃদ্ধ মালিক আমাকে বলেছিলেন,“দিনে যেতে পারেন। ছবি তুলতে পারেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর থাকবেন না।”আমি হেসে বলেছিলাম,“কেন?”বৃদ্ধ আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন,“কারণ তখন বাড়িটা আপনাকে চিনবে।”কথাটা শুনে আমি হেসেছিলাম।তখনও বুঝিনি, বৃদ্ধ মজা করেননি।
২. মজুমদার পরিবারের শেষ রাত
প্রায় আশি বছর আগে এই বাড়িতে থাকতেন জমিদার হরনাথ মজুমদার, তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে।এক বর্ষার রাতে পুরো পরিবার হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়।পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা বাড়ির দরজা খোলা অবস্থায় দেখতে পায়।রান্নাঘরে খাবার পড়ে ছিল।ডাইনিং টেবিলে পাঁচটি প্লেট সাজানো ছিল।একটি ঘড়ি থেমে ছিল—রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।কিন্তু বাড়ির ভিতরে কোনো মানুষ ছিল না।কোনো লড়াইয়ের চিহ্ন ছিল না।কোনো রক্ত ছিল না।এমনকি পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও সব জায়গায় ছিল।শুধু মানুষগুলো ছিল না।পুলিশ এসেছিল।অনেক খোঁজ হয়েছিল।কেউ আর ফিরে আসেনি।তারপর থেকে বাড়িটি পরিত্যক্ত।কিন্তু আসল রহস্য শুরু হয়েছিল তারও কয়েক বছর পরে।
৩. প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা
আমি প্রথম দিন বিকেল পাঁচটার দিকে বাড়িতে ঢুকলাম।আমার সঙ্গে ছিল ক্যামেরাম্যান সায়ন।বাড়ির প্রতিটি ঘর আমরা ক্যামেরায় ধারণ করছিলাম।উপরতলায় একটি ঘরে গিয়ে দেখি দেওয়ালে পরিবারের পুরনো ছবি ঝুলছে।একটি ছবিতে পুরো মজুমদার পরিবার দাঁড়িয়ে আছে।হরনাথ মজুমদার।তাঁর স্ত্রী।দুই ছেলে।মেয়ে।আমি ছবিটার ক্লোজ শট নিলাম।তারপর সায়ন বলল,“দাদা, এখানে একজন কম কেন?”আমি ছবির দিকে তাকালাম।সত্যিই।ছবিতে পাঁচজন নয়—ছয়জন।পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি অচেনা ছেলে।কালো পোশাক।ফ্যাকাশে মুখ।আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—ছেলেটির মুখে কোনো চোখ-মুখের বৈশিষ্ট্যই যেন ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।আমি ভাবলাম, হয়তো ছবির পুরনো দাগ।ক্যামেরা বন্ধ করে আমরা নিচে নেমে এলাম।তখনও সন্ধ্যা নামেনি।
৪. রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে
সন্ধ্যা ৬টা ১২ মিনিটে বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল।প্রথমে আমরা একটা শব্দ শুনলাম।টুপ... টুপ... টুপ...মনে হচ্ছিল ওপরতলায় কেউ হাঁটছে।সায়ন বলল,“বিড়াল হবে।”কিন্তু শব্দটা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।টুপ...টুপ...টুপ...তারপর থেমে গেল আমাদের ঠিক মাথার ওপর।আমি ক্যামেরা নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোলাম।কেউ নেই।কিন্তু তখনই লক্ষ্য করলাম—দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা চলছে।আমি অবাক হয়ে গেলাম।বাড়ির সব ঘড়ি বন্ধ থাকার কথা।এই ঘড়িটা চলছে।কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে।১২টা ১৬ মিনিট।আর এক মিনিট পর—১২টা ১৭।ঠিক সেই মুহূর্তে ঘড়িটা থেমে গেল।একই সঙ্গে বাড়ির সব দরজা—ধাম!একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।সায়ন ফিসফিস করে বলল,“দাদা... আমরা কি বেরোব?”আমি দরজার কাছে গিয়ে হাতল ঘুরালাম।দরজা খুলল না।
৫. বাড়ির ভিতরে আরেকটি বাড়ি
প্রায় দশ মিনিট পর দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।আমরা বাইরে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলাম।কিন্তু সিঁড়ির সামনে এসে আমি থেমে গেলাম।কারণ—সিঁড়িটা আগের মতো ছিল না।আগে যেখানে দশটি ধাপ ছিল, এখন সেখানে অন্তত কুড়িটি।সায়ন আমার দিকে তাকিয়ে বলল,“এটা আগে এমন ছিল?”আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।আমরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম।উপরতলায় পৌঁছে দেখি—একটা দীর্ঘ করিডোর।কিন্তু আমরা যখন এসেছিলাম, সেখানে কোনো করিডোর ছিল না।দুই পাশে সারি সারি দরজা।প্রতিটি দরজার ওপর একটা করে নাম লেখা।হরনাথ।সুরমা।অরুণ।বিনয়।মাধবী।শেষ দরজাটার ওপর কোনো নাম নেই।শুধু একটি সংখ্যা—৬।আমি দরজার কাছে যেতেই ভেতর থেকে খুব ধীরে একটা শব্দ এল।একজন শিশু ফিসফিস করে বলল—“তুমি এত দেরি করলে কেন?”আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।কারণ কণ্ঠটা এসেছিল—আমার নিজের কণ্ঠে।
৬. ক্যামেরায় যা ধরা পড়েছিল
আমি আর সায়ন দৌড়ে নিচে নেমে এলাম।কোনোমতে বাড়ির মূল দরজা খুলে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম।গাড়িতে উঠে প্রথম কাজ ছিল ক্যামেরার ফুটেজ দেখা।প্রথম কয়েক মিনিট স্বাভাবিক।তারপর আমরা ছবির ঘরটায় পৌঁছাই।আমি ভিডিও pause করলাম।দেয়ালে ঝোলানো পরিবারের ছবিটি দেখা যাচ্ছে।কিন্তু এবার ছবিতে ছয়জন নয়।সাতজন।নতুন একজন দাঁড়িয়ে আছে।আমি।আমার পোশাক একই।আমার হাতে একই ক্যামেরা।আমি ছবির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।কিন্তু ভিডিওতে তখন আমি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম না।আমি ছিলাম সায়নের পাশে।সায়ন ভিডিওটা দেখে চুপ করে গেল।তারপর বলল,“দাদা... এটা বন্ধ করুন।”আমি জিজ্ঞেস করলাম,“কেন?”সে ক্যামেরার screen-এর দিকে আঙুল দেখাল।ছবির একেবারে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অচেনা ছেলেটা—এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।আর তার ঠোঁট নড়ছে।কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না।কিন্তু ঠোঁট পড়তে আমার বেশি সময় লাগেনি।সে বলছিল—“আর একজন এসেছে।”
৭. বাড়ি থেকে বেরিয়েও কি বেরোনো যায়?
আমরা গাড়ি নিয়ে গ্রামের দিকে ফিরতে শুরু করলাম।রাত তখন প্রায় দশটা।কিন্তু পাঁচ মিনিট গাড়ি চালানোর পর সায়ন হঠাৎ বলল,“দাদা... আমরা কি ভুল রাস্তা নিয়েছি?”আমি সামনে তাকালাম।রাস্তার দুপাশে শালগাছ।সামনে কুয়াশা।আর বাঁদিকে একটা পুরনো লোহার গেট।গেটের ওপরে লেখা—মজুমদার বাড়ি।আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।আমরা আবার সেই বাড়ির সামনে।সায়ন গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা নিল।দশ মিনিট পর আবার একই গেট।তৃতীয়বার চেষ্টা করলাম।আবার একই জায়গা।শেষ পর্যন্ত গাড়ি বন্ধ করে আমরা রাস্তার পাশে বসে রইলাম।তখনই সায়ন বলল,“দাদা, একটা কথা বলব?”“বল।”“আমাদের গাড়ির পিছনের সিটে কেউ বসে আছে।”আমি ধীরে ধীরে পিছনে তাকালাম।সিট খালি।কিন্তু সিটের ওপর পড়ে আছে একটা পুরনো কালো কোট।আমি সেটা হাতে তুলে নিতেই কোটের পকেট থেকে একটা কাগজ পড়ে গেল।কাগজে লেখা—“ষষ্ঠ মানুষটি এখনও বাড়ি ফেরেনি।”
৮. শেষ রাত
রাত ১২টা ১৭ মিনিট।আমরা আবার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে।কীভাবে সেখানে ফিরে এলাম, আজও জানি না।কিন্তু এবার বাড়িটা আর পরিত্যক্ত দেখাচ্ছিল না।সব জানালায় আলো জ্বলছে।দরজার সামনে শুকনো ফুলের মালা।ভেতর থেকে হাসির শব্দ।মনে হচ্ছিল—বাড়িতে আজ কোনো উৎসব।সায়ন বলল,“আমরা ঢুকব না।”আমি বললাম,“আমার ক্যামেরা ভিতরে।”সে আমার হাত চেপে ধরল।“ক্যামেরা থাক।”কিন্তু তখন বাড়ির ভেতর থেকে একটা শিশুর কণ্ঠ ভেসে এল—“রুদ্রনীল...”আমি স্থির হয়ে গেলাম।কারণ সায়ন কখনো বাড়িতে আমাকে নাম ধরে ডাকেনি।কণ্ঠটা আবার এল।এবার একটু কাছে।“রুদ্রনীল... তোমার জায়গাটা খালি আছে।”দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।ভেতরে টেবিল সাজানো।ছয়টি প্লেট।ছয়টি চেয়ার।আর দেওয়ালে সেই পুরনো ছবিটি।এবার ছবিতে—ছয়জন মানুষ।আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম—সেই অচেনা ছেলেটি আর নেই।তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—আমি।
৯. ভোর
সায়ন আমাকে টেনে বাইরে নিয়ে আসে।আমরা কোনোভাবে গাড়িতে উঠে গ্রামে ফিরে যাই।ভোরের আলো ফুটতেই আমি ক্যামেরাটা পরীক্ষা করি।শেষ ফুটেজে শুধু একটি দৃশ্য।আমি বাড়ির ভিতরে দাঁড়িয়ে আছি।কিন্তু বাস্তবে সেই সময় আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম।ভিডিওতে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই পরিবারের পাঁচজন সদস্য।আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই অচেনা ছেলে।সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে।তারপর ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসে।স্ক্রিন কালো হয়ে যাওয়ার আগে শেষ যে কথাটা শোনা যায়—“আজ তুমি বেরিয়ে গেলে... কিন্তু বাড়িটা তোমার সঙ্গে বেরিয়ে গেছে।”আমি ভেবেছিলাম গল্পটা সেখানেই শেষ।কিন্তু পরদিন সকালে নিজের বাড়িতে ফিরে আমি একটা জিনিস দেখতে পেলাম।আমার বসার ঘরের দেওয়ালে একটা নতুন ছবি ঝুলছে।আমি ছবিটা কখনও তুলিনি।ছবিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি।আমার পাশে সায়ন।আর আমাদের পিছনে—মজুমদার বাড়ি।ছবির নিচে তারিখ লেখা—আজকের তারিখ।আমি ছবিটা নামাতে গিয়ে থেমে গেলাম।কারণ ছবির জানালার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে এবার খুব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।সে হরনাথ মজুমদার নয়।সে সেই অচেনা ছেলেটিও নয়।সে—আমি।আর ঠিক তখনই আমার ঘরের ওপরতলা থেকে সেই পরিচিত শব্দটা ভেসে এল—টুপ... টুপ... টুপ...আমি জানতাম, আমাদের বাড়িতে ওপরতলা নেই।তবু সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম—সেখানে একটা নতুন সিঁড়ি তৈরি হয়েছে।সিঁড়ির প্রথম ধাপে লেখা—“ষষ্ঠ ঘর।”আমি আর পিছনে তাকাইনি।শুধু ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম।কারণ এবার আমি বুঝে গিয়েছিলাম—মজুমদার বাড়ি কোনো জায়গা ছিল না।ওটা ছিল এমন এক বাড়ি, যে বাড়ি তার পরের বাসিন্দাকে নিজেই বেছে নেয়।আর সেই রাতে আমার দরজায় প্রথমবার কড়া নাড়ল—আমারই কণ্ঠ।






