মহাকালের সিগন্যাল
মহাকালের সিগন্যাল
১. নিশীথ রাতের অমঙ্গল
পূর্ব ভারতের রেললাইনের একবারে নির্জন প্রান্তে অবস্থিত একটি কেবিন স্টেশন ‘গোলাপডিহি ’। গভীর রাতে চারপাশের ঘন শাল ও মহুয়া বন এমন এক গাঢ় অন্ধকার তৈরি করে যে, স্টেশনের অনুজ্জ্বল সোডিয়াম ল্যাম্পের আলোও সেখানে একেবারে ‘ম্লান ও দুর্বল মনে হয় । দীর্ঘ দূরত্বের এক্সপ্রেস ট্রেনগুলি এই স্টেশনে থামে না; তীব্র বেগে ধুলো উড়িয়ে একটা বিকট গোঙানির শব্দ তুলে স্টেশন ছাড়িয়ে চলে যায়। এই নিস্তব্ধ, একাকী কেবিনে রাত বারোটা থেকে শুরু হয় রাকেশের ডিউটি। অ্যাসিস্ট্যান্ট সিগন্যাল কেবিন অপারেটর রাকেশের কাছে চলন্ত ট্রেনের ধাতব খটখট শব্দ আর সিগন্যাল বোর্ডের লাল-সবুজ আলোর ঝিলিকই রাতজাগা অভ্যস্ত পরিবেশ ।
সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। কুয়াশা আর কয়লার ধোঁয়ায় চারপাশটা এক দমবন্ধ করা থমথমে রূপ নিয়েছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুটো বেজে পনেরো মিনিট। ডাউন লাইনে দূরপাল্লার একটি মালগাড়ি পার হওয়ার সিগন্যাল দিতেই রাকেশের চোখ আটকে গেল আউটার সিগন্যাল পোস্টের ঠিক নিচে। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান হলদেটে আলোয় দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ অবয়ব। কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়; শরীরটা যেন জমাট বাঁধা ধূসর কুয়াশা আর ধোঁয়া দিয়ে তৈরি এক অশরীরী ছায়ামূর্তি! মূর্তিটার কোনো স্পষ্ট মুখাবয়ব নেই, অথচ তার অঙ্গভঙ্গি ছিল তীব্র আকুলতায় ভরা। সে যেন নিজের দুই হাত শূন্যে ছুড়ে রাকেশকে কিছু একটা বলার বা থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
রাকেশের বুকের ভেতরটা এক লহমায় হিম হয়ে গেল। সে চোখ রগড়ে আবার তাকাল, কিন্তু ছায়ামূর্তিটি ততক্ষণে অন্ধকারের গভীরতায় বিলীন হয়ে গেছে। রাকেশ নিজেকে সান্ত্বনা দিল যে, এটা হয়তো তার বিনিদ্র চোখের ক্লান্তিজনিত কোনো বিভ্রম। কিন্তু তার সেই ভুল ভাঙল ঠিক চার মিনিট পর।
হঠাৎ এক বিকট, ধাতব চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার শব্দে ‘গোলাপডিহির’ জঙ্গল কেঁপে উঠল। সেই মালগাড়িটি আউটার সিগন্যাল পার হওয়ার আগেই লাইনচ্যুত হয়ে আছড়ে পড়েছে আউটার সিগনালের একটু বাইরে আপ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের ওপর! চারপাশের নিস্তব্ধতা চিরে বাতাসে ভেসে এল মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার রোল। রাকেশের চোখের সামনে তখন কেবল ভাসছিল সেই ছায়ামূর্তির ব্যাকুল ইশারা। সে কি তবে কোনো আসন্ন ধ্বংসের দূত, নাকি এক অশুভ শক্তির মায়াজাল?
২. সতর্কবার্তা ও দ্বিতীয় বিপর্যয়
গোলাপডিহি স্টেশন চত্বরে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন ধরে এক ভারী, থমথমে নীরবতা ছেয়ে ছিল। তদন্তকারী দলের দীর্ঘ জেরা সামলাতে হলেও রাকেশ সেই অশরীরী রূপের কথা কাউকেই প্রকাশ করতে পারেনি—সবাই তাকে উন্মাদ ভাববে এই ভয়ে। অন্তর্দাহ আর তীব্র মানসিক আঘাত তাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। দেখতে দেখতে প্রায় তিনটি মাস পার হয়ে গেল, কিন্তু সেই ছায়ামূর্তির আর কোনো দেখা পাওয়া গেল না। রাকেশ মনে মনে সান্ত্বনা পেতে শুরু করেছিল যে, হয়তো পরিশ্রান্ত মস্তিষ্কের কোনো বিভ্রান্তিই ছিল সেই রাতের ভয়াবহ দৃশ্য।
তবে নিয়তির নির্মম পরিহাসের তখনও অনেক বাকি ছিল।
সেদিনও রাতটা ছিল ঘোর নিস্তব্ধ ও কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সময় তখন রাত একটা বেজে চল্লিশ মিনিট। নির্জন কেবিনে বসে রাকেশ পরবর্তী ট্রেনের সময়সূচি মেলাচ্ছিল, এমন সময় আকস্মিকভাবে ঘরের আবহাওয়া বরফের মতো শীতল হয়ে গেল। এক অদৃশ্য তরঙ্গ এসে জানলার কাচগুলোকে কাঁপিয়ে তুলল। রাকেশের হৃদয় এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। জানলার বাইরে তাকাতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল—আউটার সিগন্যাল পোস্টের নিচে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে সেই চেনা ধূসর অবয়ব!
এবার তার আকুলতার মাত্রা ছিল আরও ভয়ংকর। সে শুধু হাতই নাড়ছিল না, ধোঁয়াটে শরীরটা বাতাস চিরে সোজা রাকেশের কেবিনের দিকেই ধেয়ে আসতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই, নির্জন কেবিনের স্তব্ধতা ভেঙে তার কানের কাছে ভেসে এল এক অতিপ্রাকৃতিক, ভারী ফিসফিসানি—”সাবধান হও!”
সেই কণ্ঠস্বর রাকেশের মগজের ভেতর তীব্র যন্ত্রণার মতো বাজতে থাকল। আতঙ্কে অমনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। কিন্তু চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ছায়ামূর্তিটি আবার অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে গেল। ঠান্ডা ঘামে রাকেশের সারা শরীর ততক্ষণে ভিজে উঠেছে। সিগন্যাল বোর্ডে তো কোনো ত্রুটি নেই, তবে কিসের বিষয়ে তাকে সাবধান করা হচ্ছে?
পরের দিন দুপুর গড়াতেই পাওয়া গেল সেই প্রশ্নের মর্মান্তিক উত্তর। গোলাপডিহি স্টেশন পেরোনোর মুখেই ডাউন লাইনে ছুটন্ত এক দ্রুতগামী মেল ট্রেন বিকট শব্দে লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। ইঞ্জিনটা ট্র্যাক ছেড়ে ছিটকে আছড়ে পড়ে মাটিতে। ভাগ্যক্রমে এবার কোনো প্রাণহানি না হলেও বহু যাত্রী সাংঘাতিকভাবে জখম হন।
দ্বিতীয় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর রাকেশের মানসিক ভারসাম্য প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। সে নিজেকে এক জটিল ও দুর্ভেদ্য মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধার মধ্যে আবিষ্কার করল। স্টেশন মাস্টার কিংবা রেলওয়ের উচ্চপদস্থ অফিসারদের কাছে এই অশরীরী ও রহস্যময় ছায়ামূর্তির উপস্থিতি প্রকাশ করাও তার পক্ষে অসম্ভব ছিল; কারণ তাতে কেবল নিজেকে উন্মাদ প্রমাণ করা আর চাকরি হারানোর ঝুঁকিই থাকত। অন্যদিকে, সেই ছায়ামূর্তি বারবার আবির্ভূত হয়ে ঠিক কী বার্তা দিতে চাইছে কিংবা কোন অদৃশ্য সত্য প্রকাশ করতে চাইছে, তা অনুধাবন করাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। চরম একাকীত্ব, অসহায়ত্ব এবং গভীর আতঙ্ক তাকে প্রতি রাতে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করতে শুরু করল।
৩. তৎপরতা ও এক অলৌকিক রক্ষা
গোলাপডিহি স্টেশনের রেলপথে নতুন ট্র্যাক বসানো শেষ হয়েছে এবং ট্রেন চলাচলও স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে, দেখতে দেখতে ট্রেন দুর্ঘটনার এক মাস কেটে গেল। তবে রাকেশের মনের ভেতরের অস্থিরতা কাটেনি। বিনিদ্র রজনী ও তীব্র অবসাদে তার চোখের নিচে কালির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; তাও প্রতি রাতের ডিউটিতে জানলার ওপারেই আউটার সিগন্যালের দিকে অজানা এক আতঙ্কে তাকিয়ে থাকা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে
রাত তখন দুটো বেজে পনেরো মিনিট, চারদিকে চলছে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি। শাল ও মহুয়ার ঘন জঙ্গল যেন ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে এক পৈশাচিক মেজাজে দুলছিল, আর ঘন ঘন বাজ পড়ার আলোয় ট্রেনের চকচকে ইস্পাত ট্র্যাকগুলো মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠছিল। ঠিক সেই সময়েই আপ লাইন দিয়ে একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন গোলাপডিহি পেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, এবং একই সাথে ডাউন লাইনে সবুজ সংকেত পেয়ে ধেয়ে আসছিল লোহা বোঝাই এক বিশাল মালগাড়ি।
হঠাৎ করেই আলো নিভে অন্ধকার নেমে এল কেবিনের ভেতর। জেনারেটর চালু হওয়ার আগেই রাকেশ অনুভব করল ঘরের চারপাশ থেকে ধেয়ে আসছে সেই অতিপরিচিত বরফ-শীতল হিমেল হাওয়া, আর জানলার কাচগুলো বিকট শব্দে কাঁপছিল। কাঁপতে থাকা হাতে রাকেশ টর্চের আলো ফেলে বাইরে দৃশ্যটা দেখেই চমকে উঠল—আউটার সিগন্যাল পোস্টের নিচে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সেই ধূসর ছায়ামূর্তি!
তবে এবার তার রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে শুধু হাত নাড়ছিল না, বরং দুই হাত মাথার ওপর তুলে এক চরম বিপদের সংকেত দিচ্ছিল। তার ধোঁয়াটে অবয়ব থেকে এক তীব্র, আর্তনাদের মতো শব্দ বাতাসের বুক চিরে রাকেশের কেবিনের স্পিকারে এসে আছড়ে পড়ল—”সাবধান হও! এখনই সাবধান হও!”
রাকেশের মগজে যেন একঝিলিক বিদ্যুৎ খেলে গেল। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে, অলৌকিক এক অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভর করে সে টের পেল এক মহা বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে। নিজের সমস্ত শঙ্কা ও ভয়কে একপাশে সরিয়ে সে অভূতপূর্ব উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিল। কাঁপনধরা হাতে ইন্টারলকিং প্যানেলে হাত চালিয়ে আপ ও ডাউন—উভয় লাইনেরই ট্রাফিক সংকেত মুহূর্তের মধ্যে ‘লাল’ মোডে বদলে দিল সে। একই সাথে ইমার্জেন্সি ওয়্যারলেসে তীব্র কণ্ঠে দুই ট্রেনের চালককেই অবিলম্বে জরুরি ব্রেক কষার নির্দেশ পাঠাল।
ঠিক তিন মিনিটের মাথায়, এক তীব্র কানফাটানো ধাতব শব্দের বিকট ঘর্ষণে গোলাপডিহি স্টেশন কেঁপে উঠল। কেবিন থেকে রাকেশ টর্চের আলো ফেলে যা প্রত্যক্ষ করল, তাতে তার শিউরে ওঠার জোগাড় হলো। ইন্টারলকিং সিগন্যালের প্রযুক্তিগত ত্রুটির দরুন আপ লাইনের প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি ভুল ট্র্যাকে চলে এসেছিল, আর ঠিক বিপরীত দিক থেকেই ধেয়ে আসছিল সেই প্রকাণ্ড মালগাড়িটি! ভাগ্যক্রমে রাকেশের সময়মতো লাল সংকেত জ্বালানোর কারণে, দুটি ট্রেনই মুখোমুখি ধাক্কা লাগার মাত্র কয়েক গজ দূরে বিকট শব্দে ব্রেক চেপে থমকে গেল।
ঝড়বৃষ্টির সেই ভয়ঙ্কর রাতে এক প্রাণঘাতী মুখোমুখি সংঘর্ষের গ্রাস থেকে বেঁচে গেল হাজার হাজার যাত্রীর জীবন। পরদিন সকালে রেলওয়ে সদর দপ্তর থেকে রাকেশের এই অসামান্য সাহসিকতা, ক্ষিপ্র তৎপরতা ও অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধির স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত জানানো হলো। কিন্তু এত বড় জয়ের পরও রাকেশের অন্তরে কোনো উল্লাস ছিল না। নিজ কেবিনের নির্জন কোণে বসে সে একা একা হিসাব মেলাচ্ছিল—সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ছায়ামূর্তি কোনো অশুভ বা ক্ষতিকারক সত্তা নয়, বরং সে তো এক অদৃশ্য রক্ষাদূত! প্রতিটি বিপদ ঘনিয়ে আসার আগেই সে যেন রাকেশকে সচেতন করতে ছুটে আসে।
মুহূর্তের মধ্যে রাকেশের দীর্ঘদিনের জমানো ভয় বিলীন হয়ে গিয়ে এক অপরসীম শান্তি ও গভীর কৃতজ্ঞতাবোধে তার মন ভরে উঠল। তবে সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, নিয়তির চরম ও নির্মম পরিহাসের আরও বড় অধ্যায় তখনও তার সামনে রচিত হওয়া বাকি।
৪. নিয়তির চূড়ান্ত পরিহাস
ওই অলৌকিক ঘটনার পর পনেরো দিন পেরিয়ে গেছে। গোলাপডিহি স্টেশনের চারিদিক আজ অস্বাভাবিক শান্ত, যেন ঝড়ের পূর্বের নিস্তব্ধতা। রাকেশের মন থেকে ভয় মুছে গেছে; সে বুঝতে পেরেছে সিগন্যাল পোস্টের গোড়ায় দৃশ্যমান ধূসর ছায়ামূর্তিটি কোনো অমঙ্গল নয়, বরং এক বিশ্বস্ত সুরক্ষাদূত।
সেদিন ছিল নিঝুম, ঘন কুয়াশায় ঢাকা এক রাত। ঘড়িতে তখন রাত ৩টে ১০। হঠাৎ কেবিনের ভেতরের বাতাস বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে উঠল আর রাকেশের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল চেনা শিহরণ। সে পরম স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা নিয়ে জানলার বাইরে তাকাল—আউটার সিগন্যাল পোস্টের নিচে আবার সেই পরিচিত অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কোনো এক অদৃশ্য মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রাকেশ আর নিজের কেবিনে আবদ্ধ থাকতে পারল না। সিঁড়ি দিয়ে ধীর পদক্ষেপে নেমে এল কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার রেললাইনের ওপর, তারপর এগিয়ে চলল সেই সিগন্যাল পোস্টের অভিমুখে। ছায়ামূর্তিটি এখন তার একেবারেই সম্মুখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, অপলক চোখে রাকেশের দিকে চেয়ে আছে—তবে আগের মতো কোনো ট্রেন দুর্ঘটনার আগাম সংকেত বা চঞ্চলতা তার অবয়বে দেখা যাচ্ছে না ।
ঠিক সেই মুহূর্তে, রাতের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে রাকেশের কানের কাছে আবার প্রতিধ্বনিত হলো সেই অতল বিষাদময়, গম্ভীর অতিপ্রাকৃতিক ফিসফিসানি—”সাবধান হও!”
রাকেশ স্তম্ভিত হয়ে ভাবল, সিগন্যাল বোর্ডে তো কোনো গোলযোগ নেই, তবে কিসের এই সাবধানবাণী?
হঠাৎ অন্ধকার আর ঘন কুয়াশার মায়াজাল চিরে পেছন দিক থেকে ধেয়ে এল এক ঘাতক ট্রেন। মুহূর্তের মধ্যে তা রাকেশকে পিষে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে চলে গেল। এক বীভৎস শব্দে থমকে গেল যেন পুরো গোলাপডিহির জঙ্গল।
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই রেললাইনের ওপর থেকে উদ্ধার হলো রাকেশের রক্তে ভেজা, ক্ষতবিক্ষত দেহ।
রেলওয়ে সেফটি বোর্ডের তদন্তে উঠে এল এক আশ্চর্যজনক তথ্য—পূর্ববর্তী স্টেশনের আগেই একটি মালগাড়ির কাপলিং আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেই বিচ্ছিন্ন হওয়া পেছনের অংশটি তীব্র গতিতে ছুটে এসে পিষে দিয়ে যায় রাকেশকে। তীব্র কুয়াশা ও আগাম কোনো সংকেত না থাকায় বিপদের উপস্থিতি টেরই পাননি তিনি। উপরন্তু, কাপলিং ছিঁড়ে যাওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় ইমার্জেন্সি ব্রেক ব্যবস্থার কাজ করার কথা থাকলেও, তা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে নিঝুম রাতে সিগন্যাল পোস্টের কাছে রাকেশ কেন দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার কোনো উত্তর মেলে নি।
আসলে সেই রহস্যময় ছায়ামূর্তিটি কোনো রেল দুর্ঘটনা আটকানোর দূত ছিল না; সে ছিল মহাকালের এক অশুভ সংকেত। কোনো ট্রেনের বিপর্যয় নয়, বরং রাকেশের নিজের ওপর নেমে আসা নিশ্চিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই সে বারবার ফিসফিসিয়ে সাবধান করছিল—”সাবধান হও!”
দুর্ঘটনাস্থল থেকে যখন রাকেশের নিথর দেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই গোলাপডিহি স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছিল ডিহি এক্সপ্রেস। হঠাৎই ট্রেনের চালক কেবিনের ভেতরের আবহাওয়া এক নিমেষে হাড়হিম ঠান্ডা হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই ওয়্যারলেস স্পিকারের যান্ত্রিক নীরবতা চিরে এক গমগমে, অলৌকিক কণ্ঠস্বর বেজে উঠল—”সাবধান হও”…
Evidence
















