কায়াকল্প
কায়াকল্প
দক্ষিণ কলকাতার একটি ছিমছাম ফ্ল্যাটে সুমন ও আরতির শান্ত গৃহস্থালি। চল্লিশ ছুঁইছুঁই এই মধ্যবিত্ত দম্পতির নিঃসন্তান সংসারে সচরাচর কোনো হইচই থাকে না। আরতি ঘরের দেখ ভাল করে, আর সুমন কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব বিভাগে।
অন্যান্য দিনের মতোই সেদিনও কাজ থেকে ফিরে সুমন সোফায় আরাম করে বসেছিল। এমন সময় আরতি হাতে ধোঁয়া ওঠা আদা-চা ও দুটি বিস্কুট নিয়ে এসে টেবিলে রেখে দিল। তারপর সুমনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “চা-টা শেষ করে নাও, আমি পাশের ঘরে একটু দরকারি কাজে যাচ্ছি। এখন একদম ডেকো না কিন্তু।”
চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে টিভির রিমোটটা হাতে তুলে নেয় সুমন। নিউজের নানা খবরের ভিড়ে কখন যে আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, তার খেয়ালই ছিল না। আচমকা তার মনে হলো, সারা ফ্ল্যাট জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ডানা মেলেছে। পাশের ঘর থেকে আরতির সাড়া শব্দ তো মিলছেই না, এমনকি তার কাঁচের চুড়ির সুপরিচিত টুংটাং আওয়াজটুকুও যেন একেবারে থমকে গেছে।
চায়ের খালি কাপটা একপাশে রেখে সুমন কিছুটা কৌতূহলী ও আশঙ্কা বৃত হয়ে পাশের ঘরের আধখোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আলতো করে ভেতরে উঁকি দিতেই দৃশ্যটা দেখে তার বুকের হৃৎপিণ্ড যেন এক লাফে লাফিয়ে গলায় উঠে এলো।
আরতি মেঝেতে পড়ে ছিল এক চরম অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে— তার সমস্ত শরীর পিছনের দিকে ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। মাথার ওপরের অংশ আর পায়ের পাতা দুটো কেবল মেঝে ছুঁয়ে আছে, বাকি পিঠটা শূন্যে ভাসমান। লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর হাত দুটো দিয়ে মাটি আঁকড়ে ওপরে ওঠার ব্যর্থ আকুতিতে, সে প্রচণ্ড ছটফট করছিল— যেন এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় সে পিষ্ট।
দৃশ্যটা দেখেই সুমনের মগজে সেই ভয়াবহ শব্দটি বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল— ধনুষ্টঙ্কার! হতে পারে মৃগীরোগ কিংবা আরও কোনো মারাত্মক কিছু গ্রাস করেছে আরতিকে। আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলেও সুমন ঘরটিতে পা বাড়াল—যে-কোনো মূল্যে আরতিকে এই অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু নিজের অতিরিক্ত ওজন আর দুস্থ হৃদ্যন্ত্রের কথা ভেবে সে থমকে গেল, আরতির এমন শক্ত আড়ষ্ট দেহ তুলতে গেলে তার নিজেরই প্রাণঘাতী হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।
কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে সুমন দু-হাতে মাথা চেপে ধরে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে করিডোরে ছুটে বেরিয়ে এলো। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগল, “ওরে বাবা রে! কে কোথায় আছ, বাঁচাও! আরতি শেষ হয়ে গেল বলাইবাবু, শর্মা মশাই … দ্রুত আসুন! অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।”
সুমনের বিকট চিৎকার শুনে তিনতলার সমস্ত বাসিন্দা হন্তদন্ত হয়ে দরজার কাছে জড়ো হয়ে গেল। পাশের ঘরের বলাইবাবু তো চোর এসেছে ভেবে হাতে লাঠি নিয়েই হাজির। সবাই মিলে যেই মুহূর্তে সুমনের ঘরের ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই ভেতরের ঘরের পর্দা সরিয়ে খোদ আরতিই সামনে এসে দাঁড়াল।
তার চুলগুলো একটু আলুথালু, কিন্তু সে সম্পূর্ণ সুস্থ, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সুমনকে থরথর করে কাঁপতে দেখে আরতি কোমরে হাত রেখে তীব্র ক্ষোভের সাথে বলে উঠল, “তোমার কি কখনোই একটু বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না? না ভেবেচিন্তে হুট করে পুরো পাড়া মাথায় তুলে এমন চিৎকার শুরু করে দিলে?”
সুমন আমতা আমতা করে বলল, “না … মানে … তুমি ওরকম বেঁকে।”
“আরে, ওটা তো চক্রাসন।” আরতি চোখ রাঙিয়ে বলে উঠল, “ইউটিউব দেখে নতুন একটা যোগাসন ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। শরীরটা হঠাৎ লক হয়ে যাওয়ায় ওঠার জন্য জাস্ট ব্যালেন্সটা ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম। আর তুমি ভাবলে আমি শেষ? এক লহমায় আমার এতক্ষণের সাধনার পুরো কনসেন্ট্রেশনটাই নষ্ট করে দিলে! ছিঃ!”
দরজায় দাঁড়িয়ে বলাইবাবু ও শর্মা মশাই মৃদু হেসে পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করলেন। সুমনের কাঁধে হাত রেখে বলাইবাবু বললেন, “তাহলে আমরা এখন আসি।”
সবাই বিদায় নেওয়ার পর সুমন একেবারে হতবাক হয়ে পড়ল। চশমাটা নাক থেকে খুলে নিয়ে সে ড্রয়িংরুমের সোফায় ধপাস করে বসে বোকার মতো চেয়ে রইল। তার মনে হলো, আগামীকাল থেকে আরতির যোগাসন শুরু হলে, নিজের হৃদ্যন্ত্র চাঙ্গা রাখতে তার নিজেকেই বোধহয় প্রাণায়াম অভ্যেস করতে হবে।












