একটোপ্লাজমের ছায়া
একটোপ্লাজমের ছায়া
ক্লাবের ভেতরে তখন উত্তপ্ত আলোচনা ও বিতর্ক চলছিল। তবে মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করার আগে, এই ক্লাব এবং শহরটি সম্পর্কে সামান্য ধারণা দেওয়া যাক। গল্পটি দুমকা শহরকে কেন্দ্র করে। যে সময়ের কথা বলছি, তখন দুমকা ছিল বিহার রাজ্যের অন্তর্গত। অবশ্য বর্তমানে এটি ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলা, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। পাহাড়ে ঘেরা ভূদৃশ্য, ঘন জঙ্গল এবং নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলটির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে তার অনন্য আদিবাসী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর জন্য।
১৮৫৫ সালের ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের পরবর্তীতে বীরভূম ও ভাগলপুরের অংশ নিয়ে স্বাধীন সাঁওতাল পরগনা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্বাচিত হয় দুমকা শহর। অতঃপর, ২০০০ সালের ১৫ নভেম্বর বিহার বিভক্ত হয়ে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সৃষ্টি হলে দুমকা অঞ্চলটি এই রাজ্যের উপ-রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।
আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময় দুমকা শহরে বহু বাঙালি পরিবারের বসবাস ছিল। তাঁদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক ‘বাঙালি ক্লাব’। শহরের এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি নিয়মিত নানা সামাজিক আয়োজন ও স্থানীয় উৎসব উদ্যাপনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করত। এই ক্লাবের নিয়মিত সদস্যদেরই একজন ছিল সিদ্ধার্থ, যাকে সবাই ভালোবেসে সিধু বলে ডাকত। ক্লাবের তরুণদের মাঝে সিধুর যেমন অনুগামী বা ভক্তের অভাব ছিল না, তেমনই আবার কয়েকজন তীব্র বিরোধীও ছিল।
যে তর্ক-বিতর্কের কথা দিয়ে এই কাহিনির সূত্রপাত, তা মূলত আবর্তিত হচ্ছিল প্রেতযোনি বা অলৌকিক বিষয়কে ঘিরে। সিধু ছিল গল্প বলায় দারুণ পটু, আর তার বেশিরভাগ গল্পই হতো প্রেতযোনি সংক্রান্ত। সবাই মনোযোগ দিয়ে তার গল্প শুনত, কিন্তু শেষ হলেই জমে উঠত তুমুল বিতর্ক। আমি, তারক, যোগেনসহ আরও বেশ কয়েকজন ছেলেছোকরা তার এসব কাহিনির ঘোর বিরোধিতা করতাম। স্পষ্টই উড়িয়ে দিয়ে বলতাম— এসবই বানিয়ে বলা গাঁজাখুরি গল্প। উত্তরে সিধু শান্তভাবে বলত, “তোমরা বিশ্বাস না করলেই কি আর প্রেতযোনির অস্তিত্ব মিথ্যে হয়ে যায়?” আসল গল্পে প্রবেশের পূর্বে এই প্রাথমিক ভূমিকাটুকু না দিলে কাহিনির আবহ বা মেজাজটি পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হতো না।
মূল গল্পে প্রবেশ করা যাক। সেদিন আকাশ মেঘলা, চারপাশ বর্ষণমুখর। বিকেলের দিকে ক্লাবে গুটিকয়েক সদস্য এসে জড়ো হয়েছিল। অলস আলসেমিতে সময় কেটে যাচ্ছিল ধীরগতিতে। আসলে সিধু না থাকলে বিকেলের আড্ডাটা ঠিক জমে ওঠে না। গত চার-পাঁচ দিন ধরে সিধুর কোনো দেখা নেই। সে কোথায় গেছে, সে খবরও সঠিক কারো জানা ছিল না।
এমন সময় ঝড়ের বেগে ঘরে প্রবেশ করল সিধু। ভেজা ছাতাটি ঘরের এক কোণে দাঁড় করিয়ে রেখে সে বলে উঠল, “তোমরা তো প্রেতযোনিতে বিশ্বাস করো না, তাই না?”
“এবার তোমাদের আমি হাতেনাতে প্রমাণ দেব। একটোপ্লাজম জিনিসটা কি, জানো।”
তারক বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, “আবার শুরু হলো আর এক গাঁজাখুরি গল্প।”
তার কথায় কান না দিয়ে সিধু গম্ভীর মুখে বলল, “তোমরা কি জানো, প্রেত কিংবা আত্মা ইচ্ছা করলে নতুন দেহ ধারণ করতে পারে?”
“কার দেহ ধরবে তোমার?” যোগেন তৎক্ষণাৎ ফোড়ন কাটল।
সিধু পাত্তা না দিয়ে বুঝিয়ে বলতে লাগল, “আহা, শোনোই না! প্রেত বা আত্মার যোগাযোগের সময় মাধ্যমের কান, নাক বা মুখের মতো অঙ্গগুলো থেকে এক অদ্ভুত, আঠালো ও ইথারীয় আলোর মতো পদার্থ নিঃসৃত হয়। ওটাকেই বলা হয় একটোপ্লাজম।”
বিতর্ক দীর্ঘায়িত হচ্ছে দেখে আমি সবাইকে থামিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বললাম, “বাজে কথা রাখো, আসল ঘটনাটা কী তা বলো তো।”
সিধু তখন একটু হেসে বলল, “তাহলে শোনো … আমি কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। জমিজমাগুলোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার ছিল। গ্রামে আমার বাড়িটা একদম একপাশে, গাঁয়ের শেষ সীমানায়। দেয়ালগুলোতে নোনা ধরেছে। মাথার ওপর খড়ের ছাউনি। সেখানে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। আমি সেখানে পৌঁছে দেখি চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে আছে। জমিজমা দেখাশোনার জন্য হরিপদ নামে একটি লোক ছিল, কিন্তু সেখানে কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি গলা উঁচিয়ে দুবার হাঁক দিলাম—’হরি! হরিপদ?’
“বাবু, আমি ওপরে আছি।’ ওপর থেকে উত্তর এলো। ‘এতক্ষণ কী করছিলি ওখানে? ‘ভূতের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস কেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখি, হরিপদ হারিকেন হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো কেমন যেন নিষ্প্রাণ, ফ্যাকাশে ঠেকছিল। লণ্ঠনের আলোয় তার অবয়বটা অদ্ভুত এক ছায়া ফেলছিল মেঝের ওপর। সে নিঃশব্দে নিচে নেমে এসে আমার জন্য রান্না চাপাল। রাতে আমাকে ভাত-তরকারি বেড়ে দিয়ে সে যখন চটি জুতো জোড়া খটখট করে টেনে চলে গেল, তখন তার শরীরে কোনো মানুষের জীবনের স্বাভাবিক স্পন্দন আমি টের পাইনি। এক তীব্র অবসাদে আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?”
সিধু একটু থামল, ক্লাবের নিস্তব্ধ ঘরটায় তখন শুধু বাইরের বৃষ্টির শব্দ। সিধু ঘাড় নেড়ে বলতে লাগল, “পরদিন সকালবেলা দরজায় আচমকা ঠকঠক শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। দরজা খুলেই তো আমার হাত-পা হিম। দেখি। দরজার বাইরে সশরীরে হরিপদ দাঁড়িয়ে আছে। তার কাঁধে একটি ঝোলা ব্যাগ, কপালে চুইয়ে পড়ছে ঘাম? আমি স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হরিপদ! তুই কোথা থেকে আসছিস? তুই তো নিচে ছিলি?’
“হরিপদ অবাক হয়ে চাইল। বলল, ‘কী যে বলেন বাবু! আমি তো এই মাত্র বাস থেকে নেমে এলাম। কাল সকালে একটু গ্রামের অন্য প্রান্তে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম, কাল রাত্রিতে দূরপাল্লার বাস না পাওয়ায় আসতে পারিনি?’
“আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘কী বলছিস তুই ? তাহলে কাল রাত্রিতে আমাকে ওপরে ডেকে নিয়ে গেল কে? রান্না করে খাওয়ালই বা কে?’ হরিপদ ফ্যাকাশে মুখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আমি তখন ছুটে ওপরে গেলাম। গিয়ে দেখি, কাল রাতের সেই কফির পাত্র আর রান্নার থালাবাসন যেমন ধুয়ে রাখা ছিল, তেমনই আছে। কিন্তু হরিপদের ঘরের কোণে জমে আছে এক বিচিত্র, ইথারীয় আলোর মতো আঠালো তরল পদার্থ! আমি হতভম্ব হয়ে বসার ঘরের মেঝেতেই বসে রইলাম?”
গল্প শেষ করে সিধু আমাদের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি হাসল। তার চোখের মণি দুটো যেন লণ্ঠনের ম্লান আলোয় চকমক করে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল, “দেখলে তো, প্রেতযোনি সত্যিই আছে।”
এই বলেই সিধু যাবার জন্য তড়িঘড়ি উঠে পড়ল। বৃষ্টির ছাট তখন জানালার কাচ ছুঁয়ে ঘরের ভেতর চুইয়ে ঢুকছে। আমরা সবাই যখন তার এই অবিশ্বাস্য কাহিনির ঘোর কাটানোর চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই সিধু দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে ঘুরে তাকাল। তার মুখে তখন এক অপার্থিব, শীতল অট্টহাসি।
সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “তবে আসল রহস্যটা কোথায় জানো? আমিই যে সত্যিকারের সিধু, তার কি প্রমাণ আছে?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই, আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সিধু তার ভেজা ছাতাটি হাতে নিয়ে বাইরের ঘন কুয়াশা আর বৃষ্টির অন্ধকারের মধ্যে এক নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমরা কয়েকজন স্তম্ভিত হয়ে দরজার দিকে ছুটে গেলাম। কিন্তু বাইরের পিচঢালা রাস্তায় তখন কোনো মানুষের পদচিহ্ন নেই, কেবল ভেজা মাটির ওপর চুইয়ে পড়ে আছে এক ফোঁটা অদ্ভুত, চকচকে আঠালো তরল পদার্থ।
আমরা স্তম্ভিত হয়ে ক্লাবঘরে এসে বসলাম।
পরদিন সকালে আমরা কয়েকজন সদস্য সেখানে বসে আগের দিনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছিলাম।
ঠিক সেই সময় দরজা ঠেলে সিধু ঘরে প্রবেশ করল।
আমরা সবাই একযোগে জিজ্ঞেস করে উঠলাম, “গতকাল রাতে হঠাৎ কোথায় গায়েব হয়ে গেলে?”
“গতরাতে?” সিধু উত্তর দিল, “আমিতো এইমাত্র পৌঁছালাম। কোনো ট্রেন না পাওয়ায় সারা রাত স্টেশনেই বসে কাটাতে হয়েছে, তারপর আজ সকালে বাস ধরে এলাম।”
————- সমাপ্ত —————-
Evidence
















