অতিথি
অতিথি
দক্ষিণ কলকাতার এই নিরিবিলি পুরনো বাড়িতে গত চব্বিশ বছর ধরে কেবল দুটি প্রাণীই থাকেন— বৃদ্ধ সুধাংশুবাবু এবং তাঁর সহধর্মিণী প্রতিমা দেবী। সুবিশাল এই একতলা বাড়িটার নিস্তব্ধতা যেন সময়ের পরতে পরতে আরও গভীর হয়ে বসেছে।
শ্রাবণের এক ঝোড়ো, দুর্যোগপূর্ণ রাতে— যখন বাইরে অবিরাম বৃষ্টির শব্দ আর দমকা হাওয়ার তাণ্ডব চলছে— ঠিক রাত ১২টার সময় তাদের ড্রয়িংরুমের ভারী কাঠের দরজায় হঠাৎ পর পর তিনবার কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো।
এমন অসময়ে কে হতে পারে ভেবে সুধাংশুবাবু বেশ বিস্মিত হলেন। দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়ানো এক চব্বিশ-পঁচিশ বছরের যুবককে দেখতে পাওয়া গেল। গায়ে একটি ধূসর রঙের জ্যাকেট, বৃষ্টিতে একদম চপচপ করছে আর কপাল গড়িয়ে টপটপ করে ঝরছে জল।
“পথ হারিয়ে ফেলেছি, বাসটাও হাতছাড়া হলো,” মৃদু ও ক্লান্ত হেসে অনুরোধের সুরে বলল যুবকটি। “এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে একটু আশ্রয় মিলবে কি?”
পেছনের বারান্দা থেকে প্রতিমা দেবী এগিয়ে এলেন। ছেলেটির এমন করুণ দশা দেখে উথলে উঠল তাঁর মাতৃ হৃদয়। তিনি ব্যাকুল হয়ে স্বামীকে বললেন, — “আহা, ওকে ঘরে ডাকো! এমন দুর্যোগে ছেলেটা বাইরে কোথায় যাবে?”
বৃদ্ধ দম্পতি সানন্দে তাকে আশ্রয় দিলেন। প্রতিমা দেবী নিজেই তাকে শুকনো পোশাক দিলেন এবং পরম যত্নে গরম ভাত বেড়ে খাওয়ালেন। অল্পভাষী তরুণটির চোখে ছিল এক রহস্যময় প্রশান্তি, সে কেবল নিঃশব্দে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে মাঝে মাঝে আলতো হাসছিল।
পর দিন মেঘ কেটে মিষ্টি সোনা রোদ ফুটল। বিদায় জানানোর জন্য যুবকটি যখন দ্বারে এসে দাঁড়াল, প্রতিমা দেবী তার মুখের দিকে চেয়ে আচমকা থমকে গেলেন। রোদের আলোয় তরুণটির চেহারাটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগল।
তিনি অধীর কন্ঠে শুধালেন, — “হ্যাঁ বাবা, তোমাকে যেন কোথায় দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। আগে কখনো এ পাড়ায় এসেছ নাকি?”
তরুণটি সামান্য রহস্যের হাসি হেসে সংক্ষেপে বলল, — “হতে পারে।”
শুধু এই টুকুই। এরপর ধীর কদমে সে গলির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সুধাংশুবাবু কবাট জোড়া বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিলেন। প্রতিমা দেবী তখনও সেই বন্ধ দরজার দিকেই চেয়ে রয়েছেন। ফিসফিসানি কন্ঠে স্বামীর দিকে ফিরে বললেন, — “আচ্ছা, তুমি কি লক্ষ করেছ? ছেলেটার কথা বলার সুর, হাসির ভঙ্গি… হুবহু আমাদের বাপ্পাদিত্যর মতো না?”
সুধাংশুবাবু নীরব রইলেন। নিথর, পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি, আর কপালে ফুটে উঠল শীতল ঘামের রেখা।
কম্পিত দৃষ্টিতে তিনি আস্তে আস্তে ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে টাঙানো পুরনো ছবিটার দিকে চাইলেন। সেই ফ্রেমে মাল্যভূষিত হয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে তাদের একমাত্র সন্তান বাপ্পাদিত্য।
ছবিটির ঠিক তলায় এক খণ্ড ছোট কাগজে ফুটে আছে তার জীবনাবসানের তথ্য।
তারিখ— গতকাল ।












