📰 Breaking News • রহস্যের জগৎ 👻 ভৌতিক রহস্য 🔎 অমীমাংসিত রহস্য 🕵️ অপরাধ ও গোয়েন্দা 📜 অন্ধকার ইতিহাস 🕯️ ষড়যন্ত্র ও গোপন রহস্য Explore
Loading
রহস্যময় - Mystery Stories

সোয়াইন ফ্লু এবং শেষ উইল

সোয়াইন ফ্লু এবং শেষ উইল

প্রিয় পাঠক, মূল কাহিনির গভীরে যাওয়ার পূর্বে আসুন আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই এই গল্পের মূল চরিত্রগুলির সাথে :

১. মেজর সূর্য নারায়ণ সিনহা : প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন পাওয়া পুরোনো চোটের কারণে কিছুটা খোঁড়ালেও, তাঁর মূল বৈশিষ্ট্য খামখেয়ালি স্বভাব ও চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ থাকা। দক্ষিণ কলকাতার শতবর্ষী এক ব্রিটিশ আমলের বাড়িতে তাঁর বসবাস। ঘরটি ভরপুর বইপত্র, ভাঙা মেকানিক্যাল ঘড়ির যন্ত্রপাতি আর একটি আরামকেদারায়। তাঁর একটিই মূল দর্শন—”অপরাধী যত পথই অবলম্বন করুক, অপরাধ মনস্তত্ত্বের ধরণ পালটায় না।” মনস্তাত্ত্বিক ছক মেলাতে তিনি ঘরে টানানো ম্যাপে লাল সুতো ব্যবহার করেন, কঠিন ধাঁধায় মগ্ন থাকলে হাতঘড়ি সারাই করেন এবং পান করেন কেবল বিশেষ পাহাড়ি চা।

২. রজনী : ‘দৈনিক বার্তা’ পত্রিকার চটপটে, সাহসী ও ক্ষিপ্র ক্রাইম রিপোর্টার। মেজরের প্রধান তথ্যসংগ্রহকারী— সহজ কথায় মেজরের “চোখ ও কান”।

৩. বীরেন মল্লিক : বালিগঞ্জের বিশাল অট্টালিকার ৭২ বছর বয়সি অধিপতি। চরম শুচিবায়ুগ্রস্ত ও সতর্ক স্বভাবের মানুষ। সংক্রমণের ভয়ে সবসময় নিজের কক্ষকে এয়ার-টাইট রেখে এয়ার পিউরিফায়ার চালিয়ে রাখেন। পৃথিবীর কাউকে বিশ্বাস না করলেও ভালোবাসতেন ও আস্থা রাখতেন কেবল নিজের পোষা বিড়াল ‘মলি’র ওপর।

৪. ড. অনির্বাণ মল্লিক : বীরেন মল্লিকের ভাইপো এবং তাঁর সুবিশাল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। পেশায় একজন নামজাদা ও ধূর্ত ভাইরোলজিস্ট (ভাইরাস বিশেষজ্ঞ)। 

📖 প্রথম দৃশ্য : মেজরের ড্রয়িংরুম

দক্ষিণ কলকাতার পড়ন্ত বিকেলে, মেজরের জানলা গলে আসা রোদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল তার আরামকেদারায়। চোখে চড়ানো হাই-ম্যাগনিফাইং লেন্স। মেজর সূর্য নারায়ণ সিনহা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ১৮ শতকের একটি পুরানো পকেট ঘড়ির স্প্রিং মেরামতের কাজে ব্যস্ত। পাশে রাখা রয়েছে তার প্রিয় নিজস্ব রেসিপির পাহাড়ি দার্জিলিং চায়ের কাপ, যা থেকে হালকা ধোঁয়া উবে যাচ্ছে।

এমন সময় ঘরের প্রশান্তি ভেঙে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করলেন ‘দৈনিক বার্তা’র নামকরা ক্রাইম রিপোর্টার রজনী। তার এক কাঁধে ঝুলছে ক্যামেরার ব্যাগ, আর অন্য হাতে ধরা একটা মোটা বাদামি ফাইল।

চোখ থেকে লেন্সটি না সরিয়েই মেজর পরম শান্ত কণ্ঠে মন্তব্য করলেন, “রজনী, তোমার দ্রুত পদাঘাত বলে দিচ্ছে বালিগঞ্জের বীরেন মল্লিকের আকস্মিক প্রয়াণ সংবাদটি সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পেলেও, তোমার মনকে মোটেই শান্ত করতে পারেনি ।”

রজনী বিস্মিত হয়ে মেজরের সামনের টেবিলে— অর্ধনির্মিত ঘড়ির যন্ত্রাংশের ঠিক পাশটিতে— ফাইলটি নামিয়ে রেখে বলল, “আপনি এখানে বসেই খবরটা পেয়ে গেছেন, মেজর?”

লেন্সটি সরিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মেজর উত্তর দিলেন, “সকালের ‘দৈনিক বার্তা’য় বীরেনবাবুর বিড়ালকে সম্পত্তি উইল করার সংবাদ, আর সন্ধ্যার বিশেষ সংস্করণে ওনার হৃদ্‌যন্ত্র বা ফুসফুস অকেজো হয়ে মৃত্যুর খবর— এই দুইয়ের সংযোগ ঘটানো এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু পুলিশ এই নিয়ে কী বলছে?”

রজনী আরেকটু কাছে সরে এসে বেশ গুরুত্ব দিয়ে বলতে শুরু করল, “ডাক্তারদের মতে এটা সোয়াইন ফ্লু(H1N1)। বীরেনবাবুর আগে থেকেই মারাত্মক সিওপিডি (COPD)-র সমস্যা ছিল, তাই সংক্রামিত হতে সময় লাগেনি। উপরন্তু, উনি গৃহবন্দী থাকতেন, ঘরও ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, বিষের উপস্থিতি নেই, ধস্তাধস্তিরও প্রমাণ নেই— একেবারে নির্ভেজাল স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু মেজর…” রজনী থামল, “…যে লোকটা মারাত্মক শুচিবায়ুগ্রস্ত, ঘরের বাতাসও ফিলটার করা ছাড়া শ্বাস নেন না, তিনি সম্পত্তি উইলে সই করার ঠিক বারো ঘণ্টা আগে হঠাৎ সোয়াইন ফ্লুতে মারা যাবেন? এ কথা আমার মোটেই যুক্তিসংগত মনে হচ্ছে না।”

মেজর সিনহার চোখ দুটো আগ্রহে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, মুখে ফুটে উঠল মৃদু হাসি। “বেশ চমৎকার!” তিনি বললেন, “আমার চটপটে প্রতিনিধি মাঠপর্যায় থেকে কী কী সূত্র সংগ্রহ করে আনল, দেখি?”

রজনী ঝটপট তার ফাইল খুলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মেজরের সামনে সাজিয়ে রাখল :

বীরেন মল্লিকের শোবার ঘরের তাপমাত্রা সবসময় ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির রাখার ডিজিটাল থার্মোস্ট্যাট ডেটা শিট।

ঘরের কোণে থাকা এয়ার পিউরিফায়ারের ফিল্টারের একটি অণুবীক্ষণিক ম্যাক্রো ছবি।

নিরাপত্তারক্ষীকে কাছ থেকে আদায় করা গত তিন দিনে আসা সমস্ত চিঠি ও কুরিয়ারের একটি রেজিস্টার তালিকা।

ঘড়ির ছোট পার্টসগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে মেজর তীক্ষ্ণ চোখে ছবি ও তালিকার ওপর চোখ বোলাতে শুরু করলেন। টেবিলের ওপর তার আঙুলগুলো সামরিক মার্চিংয়ের তালে বাজতে লাগল— যার স্পষ্ট অর্থ, মেজরের মস্তিষ্ক সমাধান খোঁজার কাজে নেমে পড়েছে…

টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে তাল দেওয়া হঠাৎই বন্ধ করলেন মেজর সিনহা। ল্যাপটপ স্ক্রিনে রজনীর নিয়ে আসা এয়ার পিউরিফায়ার ফিল্টারের বড়ো করে তোলা ছবিটার ওপর তিনি আরও দৃষ্টিপাত করলেন।

গম্ভীর গলায় মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “রজনী, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ সম্পর্কে তোমার কি কোনো ধারণা আছে?”

“আমি তো কোনো ভাইরোলজিস্ট নই, মেজর,” রজনী কিছুটা ইতস্তত করে মাথা চুলকে বলল। “তবে সাধারণ অভিজ্ঞতায় জানি যে ঠান্ডা বা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ফ্লু-র প্রকোপ বেড়ে যায় ।”

আরামকেদারায় হেলান দিয়ে মেজর সায় দিলেন, “একদম তাই। প্রচণ্ড গরম আর শুষ্ক বাতাসে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্রুত শক্তি হারায়। অথচ বীরেনবাবুর ঘরের থার্মোস্ট্যাট সবসময় ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির করা ছিল। এই তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা ভাইরাসের বেঁচে থাকার জন্য খুবই উপযোগী। কিন্তু মূল রহস্য হলো, যে ঘরে সার্বক্ষণিক বাতাস ফিলটার হচ্ছে এবং তিনি নিজেও বাইরে যাননি, সেখানে এই ভাইরাস প্রবেশ করল কীভাবে?”

রজনী কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “তবে কি এয়ার পিউরিফায়ারের ফিল্টারটিতেই কোনো গলদ ছিল?”

“এই ম্যাক্রো ছবিটার দিকে একটু চোখ বোলাও,” ফিল্টারের ছবিটা দেখিয়ে মেজর বুঝাতে লাগলেন। “উন্নতমানের HEPA ফিলটার বাতাসের প্রায় ০.৩ মাইক্রন সাইজের ধুলাবালি কিংবা জীবাণুকে আটকে রাখতে সক্ষম হলেও ভাইরাস কিন্তু এর থেকেও সূক্ষ্ম। তবে আসল রহস্য লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। ফিল্টারের এই বিশেষ অংশটায় কালচে দাগটা খেয়াল করেছ? এটা নিত্যদিনের জমানো ধূলিকণা নয়, বরং কোনো জীবাণু ও ফাঙ্গাসনাশক কেমিক্যালের স্পষ্ট চিহ্ন। বীরেনবাবু নিজের থাকার ঘরের এয়ার ফিল্টারটাও সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করে রাখতেন।”

কথাটা শুনে রজনী সোজা হয়ে বসল, “তার অর্থ বাতাসে ভেসে ভাইরাস ঢোকার কোনো সুযোগ ছিল না? তবে কি ঘাতক নিজে ঘরে প্রবেশ করে সরাসরি ওনাকে সংক্রামিত করেছিল?”

“বীরেনবাবুর ঘর ভেতর থেকে অর্গলবদ্ধ ছিল। আর অত্যন্ত শুচিবায়ুগ্রস্ত হওয়ার দরুন উইল সাক্ষরের পূর্বে অন্য কাউকে ঘরে প্রবেশ করতে দেওয়া ওনার পক্ষে অসম্ভব,” মেজর ব্যাখ্যা করলেন। “তাছাড়া সোয়াইন ফ্লুর শারীরিক লক্ষণ ফুটে উঠতে সাধারণত এক থেকে চার দিন সময় লাগে। এর মানে দাঁড়ায়, মৃত্যুর অন্তত চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা পূর্বেই ভাইরাসটি ওনার দেহে বাসা বেঁধেছিল।”

এরপর কুরিয়ার সার্ভিসের রেজিস্টার খাতাটির ওপর হাত রাখলেন মেজর। “রজনী, বিগত তিন দিনে বীরেনবাবুর প্রাপ্ত চিঠিপত্রের তালিকাটা ভালো করে দেখো। পরশু বিকেলের একটা এন্ট্রিতে নজর দাও—’বালিগঞ্জ ল্যাবরেটরিজ’ থেকে একটি বন্ধ খাম পৌঁছেছিল। ওখানে প্রাপ্তিস্বীকারে কার স্বাক্ষর রয়েছে?”

রজনী খাতাটা কাছে টেনে পরীক্ষা করে মন্তব্য করল, “স্বয়ং বীরেন মল্লিকেরই তো স্বাক্ষর দেখছি! তবে কোনো ল্যাবরেটরি থেকে ওনার নামে চিঠি আসার কারণ কী?”

মেজর সিনহা মৃদু হেসে উঠলেন, তাঁর চোখে এক ধরনের তীক্ষ্ণ ও বিপজ্জনক ঔজ্জ্বল্য ভেসে উঠল। “অনির্বাণ মল্লিক, বীরেনবাবুর ভাইপো, পেশায় একজন বিখ্যাত ভাইরোলজিস্ট। কাকা যে ঘরের বায়ুপ্রবাহ পর্যন্ত বিশুদ্ধ না করে শ্বাস নেন না, তা অনির্বাণের অজানা ছিল না। ফলে হাওয়া কিংবা খাবারে বিষ বা ভাইরাস মেশানোর ঝুঁকি সে এড়িয়ে গেছে। পরিবর্তে, বীরেনবাবুরই এক সাংঘাতিক পুরোনো অভ্যাসের সুযোগ নিয়েছে সে।”

“কী সেই মারাত্মক অভ্যাস?” বিস্ময়ে চোখ বড়বড়োড় করে জানতে চাইল রজনী।

“পুরোনো আমলের বহু সুচিবায়ুগ্রস্ত মানুষের মধ্যেই একটি বিশেষ অভ্যাস দেখা যায়,” মেজর বুঝিয়ে বললেন। “চিঠি বা কুরিয়ারের খাম আঠা দিয়ে সাঁটার সময় কিংবা খোলার পূর্বে তারা জিভ দিয়ে আঠার দিকটা ভিজিয়ে নেন। অনির্বাণ নিজের ল্যাব থেকে কাকার ঠিকানায় একটি ভুয়া মেডিক্যাল রিপোর্টের খাম পাঠায়। আর সেই খামের আঠার মধ্যে সে অতীব চতুরতার সঙ্গে হিমায়িত সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস মিশিয়ে দিয়েছিল।”

কথাগুলো শুনে রজনী স্তব্ধ  হয়ে গেল; মেজরের এই প্রতিটি শব্দ তার মাথায় প্রবল আঘাতের মতো আছড়ে পড়ল।

মেজর চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, “জীবন্ত ভাইরাসটি বীরেনবাবুর লালাগ্রন্থির মাধ্যমে সরাসরি শ্বাসনালিতে ঢোকে, ঠিক যখন তিনি কুরিয়ারের খামটি খোলার জন্য আঠা ভেজাতে যান। কোনো বিষ প্রয়োগ না করে, কোনো ক্ষতচিহ্ন না রেখে এবং বাইরে থেকে ঘর তালাবন্ধ রেখেই অনির্বাণ এই নিখুঁত হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করেছে— মাত্র শারীরিক মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে। সে নিশ্চিত ছিল যে ল্যাবরেটরির বাইরে কেউ এই ভাইরাসের উৎস খুঁজে পাবে না।”

প্রবল উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপজনী প্রশ্ন করল, “অসাধারণ মেজর! কিন্তু এর প্রমাণ আমরা কীভাবে জোগাড় করব?”

আরামকেদারায় সামান্য ঝুঁকে মেজর সিনজনীকে বুঝিয়ে বললেন, “বীরেনবাবু বেশ গোছানো স্বভাবের ছিলেন, তাই খামটি নিশ্চয়ই তাঁর ঘরের ডাস্টবিন কিংবা ড্রয়ারেই সংরক্ষিত আছে। পুলিশ মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর অনির্বাণ সেই ঘরে ঢুকে খোঁজাখুঁজির সুযোগ পায়নি। যদি না আগে সরিয়ে নিয়ে থাকে। রজনী, তুমি কালবিলম্ব না করে বীরেনবাবুর বাসভবনে যাও। দৈনিক বার্তার সাংবাদিক পরিচয়ে পুলিশকে বুঝিয়ে ক্রাইম সিনের শেষ কয়েকটি ছবি তোলার বাহানায় ঘরে ঢোকো। তারপর অনির্বাণের নজর এড়িয়ে সেই নির্দিষ্ট খামটি উদ্ধার করে সোজা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। খামের আঠায় থাকা ভাইরাসের স্ট্রেন অনির্বাণের ল্যাবের ভাইরাসের সঙ্গে এবং বীরেনবাবুর ডিএনএ মেলাতে পারলেই আইনের পথ সুগম হবে।”

কথা শোনা মাত্র রজনী ক্যামেরার ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে বলল, “আমি অবিলম্বে রওনা হচ্ছি, মেজর!”

নিজের ভাঙা পকেট ঘড়িটি হাতড়াতে হাতড়াতে মেজর সতর্ক করে দিলেন, “সতর্ক থেকো রজনী। শিকারি যখন বুঝতে পারে যে সে জালে আটকে যাচ্ছে, তখন সে আরও দ্বিগুণ হিংস্র হয়ে ওঠে।”

🎬 চরম মুহূর্ত : বালিগঞ্জের প্রাসাদ ও মেজরের বৈঠকখানা

বীরেন মল্লিকের প্রয়াণের ঠিক দু’দিন পরের কথা। বালিগঞ্জের সেই প্রাসাদোপম ভিটেয় তখন স্মরণসভার তোড়জোড় চলছে। স্বজন ও আইনজীবীর পরিবৃত্তে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে গম্ভীর মুখে বসে রয়েছে ডক্টর অনির্বাণ মল্লিক। তবে পিতৃব্যবিয়োগের বেদনার চেয়েও তার মুখে ফুটে উঠেছে বিষয়সম্পত্তি হাসিল করার প্রচ্ছন্ন ব্যাকুলতা।

হঠাৎই অনির্বাণের মুঠোফোনটি কেঁপে উঠল— একটি অজানা নম্বর থেকে আসা ভিডিয়ো কল। বিরক্ত হয়ে কলটি কেটে দিতে যেতেই, পর্দায় ভেসে ওঠা বার্তাটি দেখে সে থমকে গেল—”ডক্টর, আপনার গবেষণাগারের সংরক্ষিত H1N1-B22 ভাইরাসের নমুনাটি কি বালিগঞ্জের ডাক মারফতের খামেও মিলল?”

কপালে ঘাম জমে উঠল অনির্বাণের। ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে সে গলির এক নির্জন কোণে গিয়ে ফোনটা ধরল।

পর্দায় দৃশ্যমান হলো দক্ষিণ কলকাতার সেই বনেদি ঘরের চিত্র। আরামচেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে পাহাড়ি চায়ে চুমুক দিচ্ছেন মেজর সূর্য নারায়ণ সিনহা। আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে অপরাধবিষয়ক সংবাদ সংগ্রাহক রজনী , যার হাতে সরকারি সিলমোহরযুক্ত এক ফরেনসিক প্রতিবেদন।

“আপনি কে? আর কেনই বা আমাকে এসব অনর্থক বার্তা পাঠাচ্ছেন?” নিজের গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে অনির্বাণ প্রশ্ন করল।

পর্দার ওপার থেকে মেজরের মুখে দেখা গেল মৃদু হাসি। “ডক্টর, আমি মেজর সূর্য নারায়ণ সিনহা। অবসরপ্রাপ্ত জীবনের শখ হিসেবেই ভাঙা ঘড়ি আর ধূর্ত অপরাধীদের মানসিকতা বিশ্লেষণ করে সমাধান খুঁজি। আপনার কাকা বীরেনবাবুর হত্যাকাণ্ডের নিখুঁত রহস্য উন্মোচনের উদ্দেশ্যেই এই ফোন।”

অনির্বাণ নিচু স্বরে গর্জে উঠে বলল, “হত্যাকাণ্ড! কীসের বিচারে বলছেন? কাকা তো সোয়াইন ফ্লু-তেই মারা গিয়েছেন, চিকিৎসকরাও তো সেই মর্মে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছেন!”

“অবশ্যই সোয়াইন ফ্লু। কিন্তু সেই মারাত্মক ভাইরাস ওনার ঘরে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করেনি, ডক্টর,” চায়ের কাপে চুমুক শেষ করে মেজর বললেন। “আপনি নিজের পরিকল্পনা নিয়ে বড্ড বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ভেবেছিলেন বীরেনবাবুর ঘর তো পুরোপুরি শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত, আর ওনার সিওপিডি ও লিপিড-প্রোফাইলের জটিল সমস্যা ছিল, ফলে ফুসফুসের এই ভাইরাস সংক্রমণ স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই সবাই ধরে নেবে। তবে আপনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, প্রকৃতির কাজ অপরাধ ঢেকে রাখা নয়, বরং সত্য উদ্‌ঘাটনের সূত্র সাজিয়ে রাখা।”

অনির্বাণ ফ্যাকাশে মুখে হেসে জবাব দিল, “আপনার কাছে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। পুলিশ কাকার শোবার ঘর সিল করার আগেই আমি নিজে সব খতিয়ে দেখেছি। সেখানে এমন কিছুই অবশিষ্ট নেই যা দিয়ে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়।”

“ডক্টর, আমি ভাল করেই জানি যে আপনি তাঁর ঘরের ময়লা ফেলার পাত্রটি থেকে বিষাক্ত আঠাযুক্ত কুরিয়ারের মোড়কটি সরিয়ে নিয়েছিলেন ,” মেজরের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “তবে আপনি মানুষটার স্বভাবের এক বিশেষ দিক বিচার করতে ভুল করেছেন। বীরেনবাবু অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিয়মানুবর্তী ব্যক্তি ছিলেন। প্রয়োজনীয় কোনো চিঠিপত্র বা নথি এলে খাম ছেড়ে বের করার পর তিনি আসল কাগজটি লকারের নথিপত্রে গুছিয়ে রাখতেন; আর তারিখের হিসাব রাখতে খামের গায়ে থাকা কুরিয়ারের রসিদ বা স্টিকারটি ছিঁড়ে নিজের ডায়েরির পাতায় আঠা দিয়ে সেঁটে রাখতেন !”

আপনি আগেই টের পেয়েছিলেন যে কাকা তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিজের প্রিয় পোষ্য বিড়াল “মলি”-র নামে উইল করে দিচ্ছেন। তাই আর কালবিলম্ব না করে আপনি ছক কষে ফেললেন— যার ফলে আপনার কাকা হঠাৎ মারাত্মক ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত হলেন এবং নিউমোনিয়া ও রেসপিরেটরি ফেইলিউরে প্রাণ হারালেন।

সত্যিটা শোনামাত্রই অনির্বাণের মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে ও রক্তশূন্য হয়ে গেল, ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল তার দুটো হাঁটু।

মেজর তাঁর ব্যাখ্যা অব্যাহত রেখে বললেন, “আমার সহকারী  স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় বীরেনবাবুর ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে সেই কুরিয়ার রসিদের টুকরোটি উদ্ধার করে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের তদন্তে সেই রসিদের পেছনের অংশে— যেখানে খামের বিষাক্ত আঠার স্পর্শ লেগেছিল— হিমায়িত সোয়াইন ফ্লু ভাইরাসের অবশিষ্টাংশ এবং আপনার কাকার লালার ডিএনএ (DNA) দুটোই শনাক্ত করা গেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দিষ্ট ভাইরাসের স্ট্রেনটি আপনার বালিগঞ্জস্থ ল্যাবরেটরির সরকারি স্টক রেজিস্টারে নথিভুক্ত ভাইরাসের সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন, যা প্রাকৃতিক পরিবেশে মেলে না।”

“ভুল! সব সাজানো গল্প!” অনির্বাণ বিকট গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “আমাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়।

“পলায়নের সমস্ত পথ এখন অবরুদ্ধ, ডক্টর অনির্বাণ,” ফোনের ওপার থেকে মেজর অত্যন্ত ধীরকণ্ঠে বললেন, “দয়া করে আপনার বাঁপাশের প্রবেশদ্বারের দিকে নজর দিন!”

দৃষ্টি ঘোরাতেই অনির্বাণ দেখল, বালিগঞ্জ প্রাসাদের দীর্ঘ গলিপথের দূরপ্রান্ত থেকে লালবাজারের ডিসিপি এবং চারজন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য তার দিকেই অগ্রসর হচ্ছেন।

অনির্বাণের শিথিল হাত থেকে মুঠোফোনটি সোজা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে সচল স্ক্রিন থেকে ভেসে আসা মেজরের অন্তিম বার্তাটি ঘরের বাতাসে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল—”কুচক্রী যতই সূক্ষ্ম চাল চালুক না কেন ডক্টর, আরামকেদারায় বসেই সেই চক্রান্তের শেষ বাঁধনটি ছিঁড়ে ফেলাই আমার কাজ।”

                                                                                                      ——– সমাপ্ত———–



Evidence

Name

Related Stories

১১:৪৫-এর শেষ ট্রেন

নিশীথপুর স্টেশনে প্রতিদিন রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এক অচেনা বৃদ্ধ এসে একই বেঞ্চে বসতেন, একই কামরায় উঠতেন—কিন্তু কখনও টিকিট কাটতেন ...
/

৩০৫০ সালের কাজের মানুষ

৩০৫০ সালে ঘরের কাজ আর মানুষকে করতে হয় না। শশীধরবাবু তাই কিনে আনলেন HOME-9—এক অত্যাধুনিক গৃহস্থালি রোবট, যে রান্না থেকে ...
/

অদৃশ্য এজেন্ট: যে গুপ্তচরটি মিশন শেষে আর কখনও ফিরে আসেনি

একটি গোপন মিশনে পাঠানো হয়েছিল K-17-কে—একটি অদৃশ্য গবেষণা কেন্দ্রে ঢুকে Room 17 থেকে একটি রহস্যময় ডেটা-ড্রাইভ উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু ...
/

Latest From Categories

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest Post

কায়াকল্প

অফিস থেকে ফিরে সুমন নিশ্চিন্তে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। এমন সময় পাশের ঘর একদম নিস্তব্ধ দেখে খটকা লাগায় উঁকি দিতেই তার...

You Missed

Join Our Community

Never Miss an Article

Enter your newsletter form shortcode in the Customizer → Newsletter / CTA Section.

error: Content is protected !!