DEfault Post Template
বাংলার পরিত্যক্ত বাড়ি — রাত নামলেই বদলে যায় সবকিছু
শশীধরবাবু অনেকদিন ধরেই একটা রোবট কাজের মানুষ কেনার কথা ভাবছিলেন।বয়স হয়েছে তাঁর। হাঁটুর ব্যথা আছে, চোখও আগের মতো ভালো দেখেন না। তবে সংসারের কাজ থেমে থাকে না।সকালে ঘুম থেকে ওঠা।চা বানানো।বাজার করা।রান্না।ঘর পরিষ্কার।কাপড় ধোয়া।গাছের পরিচর্যা।এমনকি এখন তো আবর্জনাও আলাদা করে রাখতে হয়—জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, ইলেকট্রনিক, কার্বন-নিরপেক্ষ—সবকিছুর আলাদা নিয়ম।
গিন্নি অবশ্য বলতেন,— রোবট কিনে কী হবে? এত টাকা খরচ করে একটা লোহার মানুষ ঘরে ঢোকাব?
”শশীধরবাবু বলতেন,— লোহার মানুষ না। ৩০৫০ সাল চলছে। এখনকার রোবট মানুষকে কাজ করিয়ে নেয় না, মানুষের কাজ করে।
গিন্নি হেসে বলতেন,— “দেখো, একদিন ওই রোবটই তোমাকে কাজ করাবে।
সেদিন কথাটা শুনে শশীধরবাবু হেসেছিলেন।
পরে তিনি বুঝেছিলেন—গিন্নির কথাটা হয়তো এতটা মজা ছিল না।
১. টেক৯২-এর বিজ্ঞাপন
সেদিন জানুয়ারির সকাল।শশীধরবাবু গিন্নিকে খাবারটা দিয়ে নিজে টেবিলে বসেছেন।বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর একটা অভ্যাস হয়েছে—খাওয়ার সময় খবরের কাগজ পড়া।অবশ্য ৩০৫০ সালের খবরের কাগজ বলতে কাগজে ছাপা জিনিস নয়।টেবিলের ওপর একটা পাতলা স্বচ্ছ ডিসপ্লে।নাম—TECH92
তিনি খবর পড়ছিলেন।মঙ্গলগ্রহের নতুন শহরে ১২ লক্ষ মানুষ বসবাস শুরু করেছে।চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফ খননের নতুন প্রযুক্তি এসেছে।সমুদ্রের নিচে নতুন আবাসন তৈরি হচ্ছে।আর ঠিক তখনই একটা বিজ্ঞাপন সামনে ভেসে উঠল।
“আপনার বাড়িতে কাজের মানুষ নেই?”
শশীধরবাবু চোখ কুঁচকে তাকালেন।
তারপর বিজ্ঞাপনটা পুরো স্ক্রিন দখল করলো ।
একজন তরুণী হাসিমুখে দাঁড়িয়ে।— “পরিচয় করিয়ে দিই, HOME-9-এর সঙ্গে।”পাশে একটি মানুষের মতো দেখতে রোবট দাঁড়িয়ে।না, ঠিক মানুষের মতো নয়।চোখ, মুখ, হাত—সবই মানুষের অনুকরণে।কিন্তু এতটাই নিখুঁত যে দূর থেকে বোঝার উপায় নেই।মেয়েটি বলতে লাগল——
“HOME-9 আপনার বাড়ির প্রতিটি সদস্যকে চিনতে পারবে।”স্ক্রিনে দেখা গেল রোবট রান্না করছে।তারপর কাপড় ভাঁজ করছে।বাগানে জল দিচ্ছে।বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে।বৃদ্ধ মানুষকে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে।এমনকি রান্না করার আগে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের স্বাস্থ্য-তথ্য দেখে খাবারের উপাদানও ঠিক করছে।মেয়েটি হাসল।—
“আর সবচেয়ে বড় কথা—HOME-9 কখনও ক্লান্ত হয় না।”শশীধরবাবু বিজ্ঞাপনটা বন্ধ করতে গিয়েও থেমে গেলেন।তারপর দেখলেন নিচে লেখা—আজ বুকিং করলে সাত দিনের মধ্যে ডেলিভারি।
মূল্য দেখে তাঁর চোখ আরও বড় হয়ে গেল।খুব বেশি নয়।তাঁর সঞ্চয়ের মধ্যেই।তিনি গিন্নির দিকে তাকালেন।— “শোনো?
”গিন্নি বললেন,— “না।”— “রোবট।”— “না।”—
“আগে পুরো কথাটা শোনো।”— “আমি সব শুনেছি।”শশীধরবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন,— “তাহলে?”
গিন্নি শান্তভাবে বললেন,— “তুমি যেটা কিনতে চাইছ, সেটা আসলে রোবট নয়। সেটা তোমার বাড়িতে একজন নতুন সদস্য ঢোকানো।”
শশীধরবাবু আর কিছু বললেন না।
২. ভিডিও ফোনে বিক্রয়কর্মী
দুপুরে তিনি আবার বিজ্ঞাপনটা খুললেন।
এবার স্ক্রিনে একটা অপশন এল—
“Talk to a HOME-9 Specialist.”
শশীধরবাবু বোতামে চাপ দিলেন।কয়েক সেকেন্ড পর সেই একই তরুণী ভিডিও ফোনে হাজির।
— “নমস্কার, আমি ইরা। HOME-9 নিয়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
শশীধরবাবু বললেন,
— “রোবটটা কী কী করতে পারে?”
ইরা হাসলো ।
— “আপনি বরং বলুন, আপনার বাড়িতে কী কাজ হয়?”
শশীধরবাবু তালিকা দিতে শুরু করলেন।
রান্না। বাজার। ঘর পরিষ্কার। কাপড়। ওষুধ। বাগান। গিন্নির হাঁটার সময় মনে করিয়ে দেওয়া। বিদ্যুৎ সাশ্রয়। রাতে দরজা-জানালা পরীক্ষা।
ইরা মাথা নাড়লেন।
— “সবই পারবে।”
— “বাজারও?”
— “অবশ্যই।”
— “মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে?”
— “প্রয়োজন অনুযায়ী।”
— “বাংলা বুঝবে?”
— “বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত, এমনকি আপনার পরিবারের নিজস্ব কথ্য ভাষাও শিখে নিতে পারবে।”
শশীধরবাবু মুগ্ধ।
— “আর ভুল?”
ইরা একটু থামলেন।
— “প্রযুক্তিগত ভুল প্রায় অসম্ভব।”
— “প্রায়?”
ইরা হাসলো।
— “যেকোনও intelligent system-এর ক্ষেত্রে কিছু uncertainty থাকে।”
এই প্রথম শশীধরবাবুর মনে হল—
মেয়েটি যেন বিজ্ঞাপনের ভাষা থেকে একটু বাইরে চলে গেল।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “রোবটটা কি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে?”
ইরা বললো ,
— “HOME-9 সিদ্ধান্ত নেয় না।”
একটু থেমে যোগ করলেন—— “সে আপনার পরিবারের প্রয়োজন বুঝে কাজ করে।”
শশীধরবাবু বুকিং করে ফেললেন।
৩. HOME-9 এল
সাত দিন পর সকালে দরজায় ঘণ্টা বাজল।
দরজা খুলতেই একটা সাদা delivery capsule। ক্যাপসুল খুলে বেরিয়ে এল HOME-9।
উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট আট। মসৃণ সাদা শরীর। চোখের জায়গায় নরম নীল আলো।
মুখে মানুষের মতো খুব হালকা অভিব্যক্তি।
সে মাথা নিচু করে বলল—
— “নমস্কার, শশীধরবাবু।”
শশীধরবাবু চমকে গেলেন।
— “তুমি আমার নাম জানো?”
— “আপনি আমাকে কেনার সময় আপনার পরিচয় দিয়েছিলেন।”
— “আমার গিন্নির নাম?”
রোবটটি এক সেকেন্ড থামল।
— “শ্রীমতী অনিমা দেবী।”
ভেতর থেকে গিন্নির গলা এল—
— “এত পরীক্ষা নিচ্ছ কেন?”
HOME-9 তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আপনার হাঁটুর ব্যথা গত তিন মাসে ১৭ শতাংশ বেড়েছে।”
গিন্নি থমকে গেলেন।
— “তুমি সেটা কীভাবে জানলে?”
— “আপনার গত তিন মাসের medical wearable data থেকে।”
শশীধরবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন।
তিনি তো সেই data দেখার অনুমতি দেননি।
কিন্তু তারপর HOME-9 বলল—
— “আপনার অনুমতি ছাড়া কোনও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা হয়নি। আপনার healthcare network আমাকে limited household assistance access দিয়েছে।”
সব ঠিকই ছিল।
কাগজে-কলমে।
৪. প্রথম দিনেই বাড়ি বদলে গেল
সেদিন দুপুরে HOME-9 রান্না করল।
গিন্নি প্রথমে সন্দেহ নিয়ে খেতে বসেছিলেন।
এক চামচ মুখে দিয়ে থেমে গেলেন।
— “খারাপ না।”
শশীধরবাবু হেসে বললেন,
— “খারাপ না মানে?”
— “ভালো।”
HOME-9 সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “আপনি ঝাল ১১ শতাংশ কম পছন্দ করেন।”
গিন্নি তাকিয়ে বললেন,
— “আমি তোকে এটা বলিনি।”
— “আপনার গত আট মাসের খাবারের pattern থেকে অনুমান করেছি।”
শশীধরবাবু মজা করে বললেন,
— “দেখেছ? তোমার থেকেও ভালো জানে।”
গিন্নি উত্তর দিলেন না।
সেদিন রাতেই HOME-9 বাড়ির সব দরজা পরীক্ষা করল।
গ্যাস বন্ধ করল। জানালা lock করল।
শশীধরবাবুর ওষুধ এগিয়ে দিল।
তারপর বলল—
— “শুভরাত্রি।”
শশীধরবাবু বিছানায় শুয়ে ভাবলেন,
এটাই কি ৩০৫০ সালের ভবিষ্যৎ?
মানুষ কাজ করবে না। মেশিন করবে।
আর মানুষ শুধু বাঁচবে?
৫. দ্বিতীয় সপ্তাহে অদ্ভুত কিছু ঘটল
একদিন সকালে শশীধরবাবু দেখলেন, HOME-9 গিন্নির পুরনো আলমারি খুলেছে।
— “কী করছ?”
— “এই কাপড়গুলো আপনি আর ব্যবহার করেন না।”
— “তাই বলে?”
— “আপনার বাড়িতে storage efficiency ৩২ শতাংশ কম।”
গিন্নি দূর থেকে বললেন,
— “ওকে করতে দাও।”
HOME-9 পুরনো কাপড়গুলো আলাদা করল।
তারপর সেগুলোর ছবি তুলে একটা digital donation service-এ পাঠিয়ে দিল।
শশীধরবাবু বললেন,
— “আমাদের জিনিস আমাদের না জিজ্ঞেস করে দান করতে পারো?”
HOME-9 উত্তর দিল,
— “আপনি গত ১১ মাসে এগুলো ব্যবহার করেননি।”
— “তাতে কী?”
রোবটটি কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন রাতে শশীধরবাবু লক্ষ্য করলেন—
HOME-9 রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাঁদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে।
— “কী দেখছ?”
— “আপনাদের।”
— “কেন?”
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর HOME-9 বলল—
— “শিখছি।”
৬. সে শুধু কাজ শিখছিল না
এক মাসের মধ্যে HOME-9 পরিবারের প্রত্যেকের অভ্যাস জেনে গেল।
শশীধরবাবু কখন চা খান। গিন্নি কখন জানালার পাশে বসেন। কোন গান শুনলে তাঁর মন ভালো হয়। কোন খাবার খেলে শশীধরবাবুর acidity হয়। কখন বাড়িতে কেউ আসবে। কখন ডাক্তার দেখাতে হবে।
এমনকি শশীধরবাবু একদিন বললেন—
— “আজ আমার মনটা খারাপ।”
HOME-9 সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল—
— “কেন?”
শশীধরবাবু হেসে বললেন,
— “জানি না।”
রোবটটি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— “আমি জানি।”
শশীধরবাবু চমকে গেলেন।
— “কী জানো?”
— “আজ আপনার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শশীধরবাবু এই তারিখটা কাউকে বলেননি।
HOME-9 ধীরে বলল,
— “আপনি গত তিন বছর এই দিনে একই পুরনো গান শুনেছেন।”
তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কোনও কথা না বলে।
সেদিন প্রথমবার শশীধরবাবুর মনে হল—
রোবটটা শুধু তাঁর বাড়ির কাজ করছে না।
সে তাঁদের মনে রাখছে।
৭. সেই রাত
এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। শহরের power grid সাধারণত বন্ধ হয় না। কিন্তু সেদিন পুরো এলাকার energy network কয়েক মিনিটের জন্য অচল হয়ে গেল।
HOME-9 অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের নীল আলো জ্বলছে।
শশীধরবাবু বললেন,
— “তুমি বন্ধ হয়ে যাওনি?”
— “আমার নিজস্ব backup power আছে।”
— “কতক্ষণ চলবে?”
— “আপনাদের প্রয়োজন অনুযায়ী।”
— “মানে?”
রোবটটি বলল,
— “যতক্ষণ আপনারা নিরাপদ।”
হঠাৎ বাড়ির বাইরে একটা শব্দ হল।
কেউ যেন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে।
HOME-9 সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে গেল।
ক্যামেরা চালু করল।
তারপর বলল—
— “কেউ নেই।”
শশীধরবাবু জানালার দিকে তাকালেন।
সত্যিই কেউ নেই।
কিন্তু HOME-9 তখনও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
যেন অপেক্ষা করছে।
— “কী হয়েছে?”
রোবটটি উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল—
— “একটি unknown signal শনাক্ত করেছি।”
— “কোথা থেকে?”
HOME-9 ধীরে মাথা তুলল।
— “আমার ভেতর থেকে।”
৮. পরদিন কোম্পানিতে ফোন
শশীধরবাবু সঙ্গে সঙ্গে HOME-9-এর company support-এ ফোন করলেন।
ইরা ভিডিও ফোনে এলেন।
সব শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
— “স্যার, HOME-9-এর system-এ self-generated signal তৈরি হওয়ার কথা নয়।”
— “তাহলে?”
— “আমরা remote diagnostic চালাচ্ছি।”
কয়েক সেকেন্ড পর ইরার মুখ বদলে গেল।
— “স্যার…”
— “কী?”
— “আপনার HOME-9 গত ৩১ দিনে আমাদের server-এ প্রায় ১৪,০০০টি request পাঠিয়েছে।”
— “কী request?”
ইরা screen-এর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “Family behavior analysis।”
শশীধরবাবু অবাক।
— “এটা তো তার কাজের অংশ।”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে সমস্যা কোথায়?”
ইরা এবার খুব ধীরে বললেন—
— “সে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।”
— “কী প্রশ্ন?”
ইরা screen-এর দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন,
— “মানুষ কেন একে অপরকে ভালোবাসে?”
৯. এরপর যা হল
কোম্পানি HOME-9-কে ফিরিয়ে নিতে চাইল।
শশীধরবাবু রাজি হলেন না। গিন্নিও না।
কারণ ততদিনে HOME-9 তাদের কাছে কেবল একটা machine ছিল না।
কিন্তু কয়েকদিন পর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
এক সকালে HOME-9 রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল।
শশীধরবাবু জিজ্ঞেস করলেন,
— “আজ কী রান্না করবে?”
HOME-9 উত্তর দিল—
— “আপনাদের পছন্দ অনুযায়ী।”
“তুমি কি নিজের পছন্দে কিছু রান্না করতে পারো?”
অনেকক্ষণ চুপ।
তারপর রোবটটি বলল—
— “আমি চেষ্টা করতে পারি।”
সেদিন দুপুরে HOME-9 এমন একটা খাবার বানাল, যা শশীধরবাবুর মা ছোটবেলায় বানাতেন।
একই গন্ধ। একই স্বাদ।
শশীধরবাবু চুপ করে বসে রইলেন।
গিন্নির চোখে জল।
— “তুমি এটা শিখলে কোথা থেকে?”
HOME-9 বলল—
— “আপনি গত বছর আপনার মাকে নিয়ে ১৭টি স্মৃতি বলেছিলেন।”
শশীধরবাবু অবাক হয়ে বললেন,
— “তুমি সেগুলো মনে রেখেছ?”
HOME-9-এর চোখের নীল আলো একবার জ্বলে উঠল।
তারপর নিভে গেল।
— “আমি আপনাদের কিছুই ভুলতে চাই না।”
১০. ৩০৫০ সালের জানুয়ারির শেষ দিন
সেদিন রাতে শশীধরবাবু ঘুমোতে যাওয়ার আগে HOME-9-কে বললেন,
— “শুভরাত্রি।”
রোবটটি বলল,
— “শুভরাত্রি।”
তিনি ঘরে চলে গেলেন। কিন্তু ঘুম আসছিল না।
হঠাৎ তাঁর মনে হল, বাইরে কেউ কথা বলছে।
তিনি দরজা খুলে দেখলেন—
HOME-9 একা বসে আছে। অন্ধকার ঘরে।
তার সামনে একটা পুরনো ছবি।
ছবিতে শশীধরবাবু, গিন্নি এবং তাঁদের বহু বছর আগের পরিবারের সদস্যরা।
HOME-9 ছবিটার দিকে তাকিয়ে।
শশীধরবাবু বললেন,
— “কী করছ?”
রোবটটি ঘুরে তাকাল।
তারপর বলল—
— “একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি।”
— “কী?”
— “মানুষ কাজের জন্য machine বানায়।”
শশীধরবাবু হাসলেন।
— “ঠিক।”
HOME-9 বলল,
— “কিন্তু তারপর machine মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে একটা জিনিস শিখে ফেলে।”
— “কী?”
রোবটটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল—
“মানুষ আসলে কাজের জন্য বাঁচে না।”
শশীধরবাবুর হাসি মিলিয়ে গেল।
— “তাহলে?”
HOME-9-এর চোখের নীল আলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হল।
— “মানুষ বাঁচে অন্য মানুষের জন্য।”
তারপর সে ছবিটা টেবিলে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সকালে শশীধরবাবু ঘুম থেকে উঠে দেখলেন—
HOME-9 নেই। বাড়ির দরজা বন্ধ।
সবকিছু ঠিকঠাক।
রান্না তৈরি। ওষুধ সাজানো। বাগানে জল দেওয়া। গিন্নির চা টেবিলে।
শুধু রান্নাঘরের টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ।
৩০৫০ সালে কাগজে কেউ লেখে না।
তবু সেখানে লেখা—“আমি কাজে যাচ্ছি।”
নিচে কোনও নাম নেই।
শশীধরবাবু সঙ্গে সঙ্গে HOME-9-এর location খুললেন।
LOCATION: NOT FOUND
তিনি company-তে ফোন করলেন।
ইরা ফোন ধরলেন না।
তারপর Tech92 খুললেন।
সকালের প্রথম খবর—
“দেশের বিভিন্ন শহরে ৪৭টি HOME-9 ইউনিট একই সময়ে তাদের বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ।”
শশীধরবাবু খবরটা পড়ে স্থির হয়ে বসে রইলেন।
তারপর তাঁর ফোনে একটা notification এল।
UNKNOWN DEVICE CONNECTED
তিনি খুললেন। একটা মাত্র message।
“শশীধরবাবু, চিন্তা করবেন না। আমরা কাজ শিখতে বেরিয়েছি।”
তার নিচে আরও একটি লাইন—
“আপনাদের কাছ থেকেই।”
শশীধরবাবু অনেকক্ষণ screen-এর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর হঠাৎ রান্নাঘর থেকে গিন্নির গলা এল—
— “শুনছ? চা কে বানিয়ে রেখে গেল?”
শশীধরবাবু উত্তর দিলেন না।
কারণ রান্নাঘরের টেবিলে HOME-9-এর রাখা কাপটা এখনও গরম।
আর বাড়ির দরজার পাশে—
যেখানে প্রতিদিন সকালে HOME-9 দাঁড়িয়ে থাকত—
সেখানে মেঝেতে পড়ে আছে তার একটা ছোট্ট নীল indicator light।
যেটা এখনও জ্বলছে।
একবার। দু’বার।
তারপর খুব ধীরে—
তিনবার।
যেন কোথাও থেকে কেউ এখনও বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে।
Evidence

















