📰 Breaking News • রহস্যের জগৎ 👻 ভৌতিক রহস্য 🔎 অমীমাংসিত রহস্য 🕵️ অপরাধ ও গোয়েন্দা 📜 অন্ধকার ইতিহাস 🕯️ ষড়যন্ত্র ও গোপন রহস্য Explore
Loading
রহস্যময় - Mystery Stories

অভিশপ্ত বাসনা

অভিশপ্ত বাসনা

লণ্ঠনের আলোটা টেবিলের ওপর রাখা মমি হয়ে যাওয়া থাবাটার ওপর অদ্ভুত একরকমের ছায়া ফেলছিল। বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি; মাঝে মাঝে মেঘের গুরুগুরু গর্জনে পুরনো কাঠের জানলাগুলো কেঁপে উঠছে।

“থাবাটা দেখতে বড় অদ্ভুত। এটা বানরের থাবা হতে পারে, কিংবা অন্য কোনো হিংস্র জন্তুরও।”

অবিনাশবাবু চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে বললেন, “তুমি সত্যিই বিশ্বাস করো ওটার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা আছে, প্রবাল?”

তাঁদের বহু বছরের পুরনো বন্ধু, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল প্রবাল সেনগুপ্ত পাইপ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ফায়ারপ্লেসের আগুনের আলোয় তাঁর মুখের কাটা দাগটা আরও গভীর ও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন, “আমি নিজের চোখে দেখেছি অবিনাশ। পূর্ব ভারতের এক তান্ত্রিকের কাছ থেকে এটা পেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন—ভাগ্যকে যারা জোর করে চালিত করতে চায়, ভাগ্য তাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়। এই থাবাটা তোমার তিনটি ইচ্ছা পূরণ করবে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটা ইচ্ছার পেছনে লুকিয়ে থাকবে একটা মারাত্মক মূল্য। তুমি জোর করে ভাগ্য বদলাতে যেও না, অবিনাশ। আমি বলব, ওটা এখনই আগুনে ফেলে দাও।”

মিসেস আরতি ট্যান্ডন এতক্ষণ সোফায় বসে উল বুনছিলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “আহা প্রবাল, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির যুগে এই সব অলৌকিক গল্প বড্ড সেকেলে শোনায়।”

“কিন্তু কিছু গল্প বাস্তবকেও হার মানিয়ে দেয়, বৌদি,” প্রবাল বলল। 
তাদের চব্বিশ বছরের একমাত্র ছেলে অনির্বাণ, স্থানীয় একটা বড় ফ্যাক্টরির চিফ ইঞ্জিনিয়ার। সে হাসতে হাসতে থাবাটা হাতে তুলে নিল। “বাবা, আমাদের তো কোনো বড় অভাব নেই। তবে হ্যাঁ, বাড়ির এই পুরোনো ঋণটা শোধ করতে পারলে ভালো হতো। চলো, চেষ্টা করেই দেখা যাক।” “বাবা, তুমি পনেরো লক্ষ টাকা চেয়ে তোমার একটা ইচ্ছের কথা জানাও তো।”

অবিনাশবাবু প্রথমে ইতস্তত করলেন, তারপর প্রবালের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা অবহেলা ভরেই থাবাটা ডানহাতে শক্ত করে ধরলেন। বিড়বিড় করে বললেন, “আমার পনেরো লক্ষ টাকার প্রয়োজন।”

ঠিক তখনই একটা কাণ্ড ঘটল। অবিনাশবাবু একটা মৃদু চিৎকার করে থাবাটা মেঝেতে ফেলে দিলেন,”কী হলো?” আরতি দেবী চমকে উঠলেন।”

ওটা… ওটা নড়ে উঠল,” অবিনাশবাবু কাঁপানো গলায় বললেন, “ঠিক যেন একটা সাপের মতো আমার হাতের মুঠোয় মোচড় দিয়ে উঠল।”

অনির্বাণ মেঝে থেকে থাবাটা তুলে টেবিলে রেখে বাবাকে সান্ত্বনা দিল, “তোমার মনের ভুল বাবা। বৃষ্টির আওয়াজ আর জানলার খড়খড়িতে তোমার মন হয়তো চমকে উঠেছে।”

সে রাতে সবাই ঘুমাতে গেল, কিন্তু অবিনাশবাবুর চোখে ঘুম ছিল না। সারারাত তাঁর মনে হতে লাগল, অন্ধকারের ভেতর ছাদ থেকে কেউ যেন একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।

পরদিন সকালটা ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত ও রৌদ্রোজ্জ্বল। রাতের সেই গা-ছমছমে ভাবটা কেটে গেছে। আরতিদেবী চা বানাতে বানাতে রাতের ঘটনাটা নিয়ে নিজেই হাসাহাসি করছিলেন। অনির্বাণ দ্রুত তৈরি হয়ে ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। সে যাওয়ার সময় বলে গেল, “টাকাটা এসে পৌঁছলে আমাকে একটা ফোন করো কিন্তু!” 

দুপুর দুটো। অবিনাশবাবু বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। এমন সময় গেটের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে স্যুট পরা এক গম্ভীর মুখের ভদ্রলোক নামলেন। তিনি সোজা এসে অবিনাশবাবুর সামনে দাঁড়ালেন।”আপনিই কি অনির্বাণ ট্যান্ডনের বাবা?” ভদ্রলোকের গলায় এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শীতলতা।”
হ্যাঁ, আমি। কিছু হয়েছে?”
অবিনাশবাবুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।

ভদ্রলোক মাথা নিচু করলেন। “আমি অনির্বাণের ফ্যাক্টরি থেকে আসছি। আজ সকালে একটা নতুন বড় হাইড্রোলিক মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করার সময় একটা যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটে। অনির্বাণ…”অনির্বাণ সেখানেই মারা গেছে। মেশিনটা ওকে পুরো শেষ করে দিয়েছে।”

ভদ্রলোক আর বলতে পারলেন না।
আরতিদেবী ততক্ষণে দরজার আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছেন; তাঁর হাতের চায়ের কাপটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা খাম বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। “কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী অনির্বাণের এই অকাল মৃত্যুর জন্য ম্যানেজমেন্ট গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।”

এটি কোম্পানির পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ। এখানে ঠিক পনেরো লক্ষ টাকার একটি চেক রয়েছে ।

নিমেষের মধ্যে বাড়িটি যেন এক জীবন্ত কবরস্থানে রূপান্তরিত হলো।

এক সপ্তাহ কেটে গেছে। অনির্বাণের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাড়িটায় এখন শুধু এক অসহ্য, ভারী নীরবতা। আরতিদেবী খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি সারাদিন অনির্বাণের ঘরের বিছানায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।

মাঝরাতের দিকে হঠাৎ আরতিদেবী বিছানায় উঠে বসলেন। একটা অদ্ভুত উন্মাদনা তাঁর চোখে। তিনি ছুটে গেলেন বসার ঘরে। অবিনাশবাবু তখন ড্রয়ারের এক কোণে থাবাটা লুকিয়ে রাখছিলেন। আরতিদেবী তাঁর হাতটা খপ করে চেপে ধরলেন।

“আরেকটা ইচ্ছে এখনো বাকি আছে, অবিনাশ! আমাদের ছেলে হয়তো ফিরে আসতেও পারে।”
অবিনাশবাবু শিউরে উঠলেন। “আরতি, তুমি পাগল হয়েছ?
“কোম্পানি থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, অনির্বাণের শরীরটা মেশিনে পিষে এমন হয়ে গিয়েছিল যে চেনার উপায় ছিল না। এমনকি কফিনের মুখটা পর্যন্ত আমাদের খুলতে দেওয়া হয়নি। তুমি কার কথা বলছ?”

“আমি কিচ্ছু জানি না!”—আরতিদেবী চিৎকার করে উঠলেন, তাঁর গলা দিয়ে পশুর মতো আওয়াজ বেরোচ্ছিল।
“ও আমার ছেলে!
ও যেকোনো উপায়ে ফিরে আসুক। তুমি তোমার ইচ্ছে জানাও, নইলে আমি নিজেই জানাব!”

অবিনাশবাবু স্ত্রীর এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি কাঁপতে কাঁপতে থাবাটা হাতে নিলেন। তাঁর মনে মনে এক তীব্র আতঙ্ক গ্রাস করছিল—যদি সত্যি অনির্বাণ ফিরে আসে, সে কেমন রূপে আসবে? সাতদিন মাটির নিচে থাকার পর একটা শরীর কেমন হতে পারে?

অবশেষে আরতির সেই উন্মত্ত আবদারে বাধ্য হয়ে, অবিনাশবাবু আতঙ্কে দুচোখ বুজে থাবাটা মুঠোর মধ্যে চেপে ধরলেন। কান্নার মতো গলায় তিনি উচ্চারণ করলেন, “আমার ছেলে অনির্বাণ যেন এখনই জ্যান্ত শরীরে আমাদের এই ঘরে ফিরে আসে।”

মুহূর্তের মধ্যে সেই অভিশপ্ত থাবাটা হাতের আঙুল এড়িয়ে সশব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। জানলার বাইরের উত্তাল হাওয়া হঠাৎ করেই থেমে গেল; চারপাশের সেই নিশ্ছিদ্র নীরবতা যেন কোনো এক অশুভ পরিণতির প্রতীক্ষায় আড়ষ্ট হয়ে আছে। এক মিনিট, দুই মিনিট করে দীর্ঘ দশটি মিনিট অতিক্রান্ত হলো, কিন্তু সেই জমাট বাঁধা স্তব্ধতা আর ভাঙল না।

অবিনাশবাবু একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বললেন, “দেখলে তো? সব অবাস্তব কল্পনা। ওই পনেরো লক্ষ টাকা পাওয়াটা নেহাতই একটা কাকতালীয় সংযোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।”

আরতিদেবী ততক্ষণে কান্নায় ভেঙে পড়ে নুয়ে পড়েছেন মেঝের ওপর। অবিনাশবাবু তাঁকে সামলে নিয়ে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবেন, ঠিক তখনই—

খট্… খট্… খট্…

নিচের সদর দরজার কাঠে অতি মৃদু, প্রায় অস্ফুট এক অশুভ টোকা পড়ার শব্দ নিস্তব্ধতা চিরে দিল।

মুহূর্তের মধ্যে দুজনেই মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে গেলেন। আরতিদেবীর বুকফাটা আর্তনাদ আতঙ্কে গলায় আটকে গেল।

খট্… খট্… খট্… এবার সেই আঘাত আগের চেয়ে অনেক বেশি সজোর ও ভারী শোনাল।

“অনির্বাণ!”—এক উন্মত্ত চিৎকারে আরতিদেবী অবিনাশবাবুর হাতের বাঁধন ছিন্ন করে সদর দরজার দিকে ছুটলেন।

“উন্মাদ হয়ো না আরতি! দোহাই তোমার, ওই অভিশপ্ত অর্গল উন্মুক্ত করো না!” অবিনাশবাবু আর্তস্বরে তাঁর শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে আটকানোর শেষ চেষ্টা করলেন।

কিন্তু আরতিদেবীর শরীরে তখন কোনো এক অলৌকিক, পৈশাচিক শক্তির আবেশ। তিনি অবিনাশবাবুকে অতি সহজে দূরে সরিয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। অবিনাশবাবু তখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে উন্মত্তের মতো বসার ঘরের ধুলোমাখা মেঝেতে সেই কুৎসিত থাবাটা হাতড়াতে লাগলেন। কোথায় সেই শয়তানের হাত? কোন অতল অন্ধকারে বিলীন হলো ওটা?

নিচে তখন সদর দরজার ভারী ছিটকিনি খোলার শব্দ হচ্ছে। লোহার শিকলটা ঝনঝন করে নড়ে উঠল।

খট্… খট্… খট্… এবার দরজার ওপর সেই আঘাত আরও হিংস্র, আরও মরিয়া। যেন কোনো শক্ত হাড় এসে আছড়ে পড়ছে দরজার কাঠে। সেই সাথে এক তীব্র, পচা মাংসের গন্ধ বন্ধ জানলার ফাঁক গলে ঘরের ভেতর চুইয়ে ঢুকতে শুরু করেছে।

“আমি আসছি বাবা, আমি আসছি!”—আরতিদেবী উন্মাদিনীর মতো লকটা ঘোরাচ্ছেন।

ঠিক তখনই আরতিদেবী দরজার শেষ খিলটা টেনে খুলে ফেললেন। ওদিকে অবিনাশবাবু মেঝের এক কোণে শেষমেশ থাবাটা খুঁজে পেলেন। তাঁর হাত কাঁপছে, কপাল বেয়ে চুইয়ে পড়ছে ঠান্ডা ঘাম। নিচের তলা থেকে তখন দরজাটা পুরোপুরি হাঁ হয়ে খুলে যাওয়ার এক ভারী, কর্কশ শব্দ ভেসে এল।

তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে তাঁর শেষ ইচ্ছেটা উচ্চারণ করলেন, “আমার ছেলে—”

কিন্তু শব্দটা ওঁর গলাতেই আটকে গেল। সিঁড়ির মুখে একটা অদ্ভুত, ভারী অন্ধকারের অবয়ব এসে দাঁড়িয়েছে। ওপরের লণ্ঠনের ম্লান আলোয় অবিনাশবাবু দেখলেন, আরতিদেবী নিচে দাঁড়িয়ে নেই। তিনি সম্মোহিতের মতো সেই অন্ধকার অবয়বটার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছেন।

বাতাসে পচা মাংস আর ভেজা মাটির তীব্র গন্ধটা এখন আর জানলার ফাঁক গলে নয়, সরাসরি ফুসফুসে এসে ধাক্কা মারছে।

“অবিনাশ, দেখো কে এসেছে…”—আরতিদেবীর গলাটা আর মানুষের মতো শোনাল না। তাতে লেগে আছে এক অপার্থিব, শীতল আনন্দ।

সিঁড়ির ম্লান আলোয় সেই বিভীষিকা পা বাড়াল। কিন্তু সে কোনো রক্ত-মাংসের জীবন্ত সত্তা নয়; হাইড্রোলিক মেশিনের পেষণে চুরমার হওয়া কঙ্কালসার শরীরের হাড়গুলো অতিপ্রাকৃত কোণে বেঁকে আছে। ফাটা চামড়ার গভীর ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়ছে কালচে রক্ত, আর তুবড়ে যাওয়া মাথার একপাশটা এক বীভৎস অবয়ব ধারণ করেছে। সবচেয়ে হাড়হিম করা দৃশ্য হলো তার সেই মণিহীন শূন্য অক্ষিকোটর, যা থেকে অবিরাম পচা জল আর কাদা গড়িয়ে নামছে।

“বাবা…” অনির্বাণের সেই বিশীর্ণ চোয়াল থেকে নির্গত হলো এক অমানুষিক যান্ত্রিক গোঙানি, “তুমি কি… ওই পনেরো লক্ষ টাকাই… প্রার্থনা করোনি?”

তীব্র আতঙ্কে অবিনাশবাবু দেয়ালের সঙ্গে কুঁকড়ে মিশে গেলেন। তাঁর মুঠোর ভেতর সেই অভিশপ্ত থাবাটা তখন এক উন্মত্ত পশুর মতো ছটফট করছে, যেন কোনো অশুভ সংহারের নেশায় সে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।

“অসম্ভব! তুমি আমার ছেলে নও! চলে যাও! দূর হও এখান থেকে!”—এক আর্তস্বরে অবিনাশবাবু চিৎকার করে উঠলেন।

“ও আমাদের ছেলে, অবিনাশ। ওকে আমি আর যেতে দেব না,”—আরতিদেবী অনির্বাণের সেই পচনশীল, হিমশীতল হাতটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অনির্বাণের ভাঙা আঙুলের ধারালো হাড়গুলো আরতিদেবীর চামড়া ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, কিন্তু আরতিদেবীর মুখে কোনো ব্যথার চিহ্ন নেই; সেখানে লেগে আছে শুধু এক পৈশাচিক উন্মাদনার হাসি।

অবিনাশবাবু বুঝতে পারলেন, তৃতীয় ইচ্ছেটা জানানোর সময়টুকু চিরতরে পার হয়ে গেছে। এই নরক-কঙ্কালকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো উপায় আর অবশিষ্ট নেই। সে ফিরে এসেছে, এবং সে একা ফিরে আসেনি—সে মাটির নিচের সেই চিরন্তন, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকেও সাথে করে নিয়ে এসেছে।

অনির্বাণের সেই মণিহীন শূন্য অক্ষিকোটর এবার অবিনাশবাবুর দিকে ঘুরল। সে এক পা, এক পা করে ওঁর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে ঘরের কাঠের মেঝেতে রক্তের চটচটে এক একটি বীভৎস ছাপ বসে যাচ্ছে।

“তুমি শেষ ইচ্ছেটা জানাবে না, বাবা?”—অনির্বাণ তার বাঁকা, মাংসহীন হাড় বের হওয়া হাতটা অবিনাশবাবুর মুখের সামনে বাড়িয়ে দিল। “ইচ্ছে জানাও… আমরা সবাই… একসাথে থাকব… মাটির নিচে…”

অবিনাশবাবু আর্তচিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু তাঁর রুদ্ধ গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। ওঁর শিথিল হাতের মুঠো থেকে থাবাটা আচমকা আলগা হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। লণ্ঠনের আলোটা দপ করে নিভে গেল, আর সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বুক চিরে ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তিনটি চেনা ও অচেনা কণ্ঠের এক বিকট, উন্মত্ত অট্টহাসি।

পরদিন সকালে পুলিশ যখন বাড়িটার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল, তারা বসার ঘরের মেঝেতে কেবল একজোড়া বৃদ্ধ দম্পতির বীভৎস লাশ পড়ে থাকতে দেখল। তাঁদের সারা শরীরে এমন সব ক্ষত, যা কোনো মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব। আর সেই ঘরের এক কোণে, ধুলোমাখা টেবিলের ওপর শান্তভাবে রাখা ছিল একটা শুকনো, মমি হয়ে যাওয়া একটা থাবা—যার প্রতিটা আঙুল এবার শক্ত করে মুঠো করা।

তার কাজ শেষ।

Evidence

Name

Related Stories

১১:৪৫-এর শেষ ট্রেন

নিশীথপুর স্টেশনে প্রতিদিন রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এক অচেনা বৃদ্ধ এসে একই বেঞ্চে বসতেন, একই কামরায় উঠতেন—কিন্তু কখনও টিকিট কাটতেন ...
/

৩০৫০ সালের কাজের মানুষ

৩০৫০ সালে ঘরের কাজ আর মানুষকে করতে হয় না। শশীধরবাবু তাই কিনে আনলেন HOME-9—এক অত্যাধুনিক গৃহস্থালি রোবট, যে রান্না থেকে ...
/

অদৃশ্য এজেন্ট: যে গুপ্তচরটি মিশন শেষে আর কখনও ফিরে আসেনি

একটি গোপন মিশনে পাঠানো হয়েছিল K-17-কে—একটি অদৃশ্য গবেষণা কেন্দ্রে ঢুকে Room 17 থেকে একটি রহস্যময় ডেটা-ড্রাইভ উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু ...
/

Latest From Categories

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest Post

কায়াকল্প

অফিস থেকে ফিরে সুমন নিশ্চিন্তে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। এমন সময় পাশের ঘর একদম নিস্তব্ধ দেখে খটকা লাগায় উঁকি দিতেই তার...

You Missed

Join Our Community

Never Miss an Article

Enter your newsletter form shortcode in the Customizer → Newsletter / CTA Section.

error: Content is protected !!