১১:৪৫-এর শেষ ট্রেন
১১:৪৫-এর শেষ ট্রেন
১১:৪৫-এর শেষ ট্রেন
শহর থেকে অনেক দূরে ছোট্ট একটা রেলস্টেশন—নিশীথপুর।
দিনের বেলায় স্টেশনটা দেখলে বিশেষ কিছু মনে হয় না। একটা ছোট টিকিটঘর, দুটো প্ল্যাটফর্ম, কয়েকটা পুরোনো বেঞ্চ আর স্টেশনের মাথায় ঝুলতে থাকা বড় একটা ঘড়ি।
কিন্তু সন্ধের পর নিশীথপুর যেন অন্য জায়গা হয়ে যায়।
বিশেষ করে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের পর।
স্টেশনমাস্টার অরুণ চক্রবর্তী এই স্টেশনে পনেরো বছর চাকরি করেছেন। রাতের স্টেশন তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরের কুকুরের ঘেউ ঘেউ, মাঝে মাঝে মালগাড়ির শব্দ—এসবের মধ্যেই তাঁর রাত কেটে যায়।
শেষ ট্রেনটাও তিনি বহুবার দেখেছেন।
রাত ১১টা ৪৫।
ট্রেন আসে।
দুই মিনিট দাঁড়ায়।
তারপর চলে যায়।
সাধারণত কামরাগুলো প্রায় খালি থাকে।
কিন্তু কয়েক মাস ধরে একটা ব্যাপার অরুণবাবুর চোখে পড়ছিল।
প্রতিদিন ঠিক ১১টা ৪৫-এ একজন বৃদ্ধ স্টেশনে আসেন।
কখনও দশ মিনিট আগে নয়।
এক মিনিট পরেও নয়।
ঠিক ১১টা ৪৫।
তিনি প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ বেঞ্চটায় গিয়ে বসেন।
পরনে পুরোনো ধূসর কোট।
মাথায় কালো টুপি।
হাতে কালো চামড়ার একটা ব্যাগ।
কাউকে দেখেন না।
কারও সঙ্গে কথা বলেন না।
ট্রেন থামলেই উঠে পড়েন মাঝের একটা নির্দিষ্ট কামরায়।
তারপর ট্রেন চলে যায়।
প্রথম দিকে অরুণবাবু ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেননি।
একজন যাত্রী।
প্রতিদিন একই সময়ে আসে।
এতে অস্বাভাবিক কী?
কিন্তু একটা বিষয় তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
লোকটা কখনও টিকিট কাটত না।
অরুণবাবু ওনাকে কখনো টিকিটের কথা জিজ্ঞাসা করেননি, উচিত ছিল, কিন্তু করে উঠতে পারেননি।
যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না।
এক রাতে অরুণবাবু আর থাকতে না পেরে বেঞ্চটার কাছে গেলেন।
বৃদ্ধ চুপ করে বসে ছিলেন।
অরুণবাবু বললেন,
— “কোথায় যাবেন?”
বৃদ্ধ মাথা তুললেন না।
অরুণবাবু আবার বললেন,
— “প্রতিদিন আপনাকে দেখি। একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
এবার বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত।
— “করুন।”
— “আপনার গন্তব্য কোথায়?”
– “কখনো টিকেট কাটেন না”
বৃদ্ধ কয়েক সেকেন্ড অরুণবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “যেখানে ট্রেনটা শেষবার থেমেছিল।”
-“আমার টিকিট কাটার প্রয়োজন হয় না।”
অরুণবাবু ভ্রু কুঁচকে গেলেন।
— “মানে?”
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
— “আপনি তো জানেন।”
তারপর উঠে দাঁড়ালেন।
ঠিক তখনই দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল।
অরুণবাবু আর কিছু বলতে পারলেন না।
বৃদ্ধ উঠে সেই একই কামরায় গিয়ে উঠলেন।
ট্রেন চলে গেল।
অরুণবাবু অনেকক্ষণ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলেন।
“আপনি তো জানেন।”
কথাটা তাঁর মাথা থেকে নামছিল না।
পুরোনো রেজিস্টার দেখতে হবে
পরদিন সকালে অরুণবাবু রেকর্ডরুমে গেলেন।
নিশীথপুর স্টেশনের পুরোনো কাগজপত্রের হিসাব কেউ রাখত না বললেই চলে। ধুলো জমা রেজিস্টার, পুরোনো টিকিট, বাতিল নোটিশ—সব একসঙ্গে পড়ে ছিল।
অরুণবাবু জানতেন না তিনি ঠিক কী খুঁজছেন।
শুধু মনে হচ্ছিল—
লোকটার কথার একটা মানে আছে।
অনেকক্ষণ পর তিনি একটা পুরোনো দুর্ঘটনার রিপোর্ট পেলেন।
তারিখ দেখে তাঁর হাত থেমে গেল।
১৭ আগস্ট, ২০০৬।
রাত ১১টা ৪৫।
নিশীথপুরের পরের লাইনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছিল।
মৃত্যু হয়েছিল বেশ কয়েকজনের।
অনেককে উদ্ধার করা হয়।
কিন্তু তিনজন যাত্রীর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
অরুণবাবু নামগুলো পড়তে লাগলেন।
প্রথম।
দ্বিতীয়।
তারপর তৃতীয় নামের পাশে থাকা ছবিটা দেখে তাঁর বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল।
ছবির মানুষটি—
গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন রাতে তাঁর স্টেশনে আসছে।
নাম—
হরিপদ সেন।
দুর্ঘটনার সময় বয়স—
৫৮।
অরুণবাবু হিসাব করলেন।
এখন তাঁর বয়স হওয়ার কথা ৭৮।
কিন্তু সেই বৃদ্ধকে দেখে পঁয়ষট্টির বেশি মনে হয় না।
আর রিপোর্টে আরও একটা কথা লেখা ছিল।
হরিপদ সেনের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি।
কালো ব্যাগ
সেদিন রাতে অরুণবাবু ঠিক করলেন, বৃদ্ধের সঙ্গে আবার কথা বলবেন।
কিন্তু রাত ১১টা ৪৫-এ বৃদ্ধ এলেন না।
১১টা ৪৪।
অরুণবাবু ঘড়ির দিকে তাকালেন।
১১টা ৪৫।
প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা।
তারপর—
দূরে ট্রেনের আলো।
কিন্তু বৃদ্ধ নেই।
ট্রেন এসে দাঁড়াল।
দুই মিনিট পর চলে গেল।
অরুণবাবু প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চটার দিকে এগিয়ে গেলেন।
সেখানেই পড়ে আছে—
কালো চামড়ার ব্যাগটা।
তিনি চারদিকে তাকালেন।
কেউ নেই।
ব্যাগটা খুললেন।
ভেতরে একটা পুরোনো পকেট ঘড়ি।
একটা মরচে ধরা চাবি।
একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট।
আর একটা ছোট কাগজ।
কাগজে লেখা মাত্র একটি লাইন—
“যে আমাকে খুঁজবে, সে-ও একদিন আমার সঙ্গে যাবে।”
অরুণবাবুর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঠিক তখন তাঁর পিছনে একটা শব্দ হল।
টক।
তিনি ঘুরে তাকালেন।
কেউ নেই।
স্টেশনের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন—
১১টা ৪৫।
কিন্তু ট্রেন তো চলে গেছে।
সেই ট্রেন
পরদিন রাতেও অরুণবাবু অপেক্ষা করলেন।
১১টা ৪০।
১১টা ৪৪।
১১টা ৪৫।
ট্রেন এল।
কিন্তু সেদিন ট্রেনটাকে অন্যরকম লাগল।
জানালাগুলো অন্ধকার।
কোনও কামরায় আলো নেই।
কোনও যাত্রীর মুখ দেখা যাচ্ছে না।
শুধু মাঝের একটা কামরায়—
হরিপদ বসে আছেন।
তিনি জানালার ওপাশ থেকে অরুণবাবুর দিকে তাকিয়ে আছেন।
তারপর ধীরে ধীরে হাত তুললেন।
ডাকলেন।
অরুণবাবু জানতেন, তাঁর ওঠা উচিত নয়।
তবু পা দুটো যেন নিজেরাই এগিয়ে গেল।
তিনি কামরায় উঠে পড়লেন।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
জানলার বাইরে যা ছিল
ট্রেন চলতে শুরু করল।
প্রথম কয়েক মিনিট অরুণবাবু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
নিশীথপুরের আলো পিছনে পড়ে গেল।
তারপর গ্রামের বাড়িঘর।
তারপর অন্ধকার।
তারপর—
কুয়াশা।
ঘন সাদা কুয়াশা।
অরুণবাবু হরিপদের দিকে তাকালেন।
— “আপনি কে?”
হরিপদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— “আপনি তো আমার নাম জানেন।”
— “আপনি কি সেই হরিপদ সেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
— “হ্যাঁ।”
— “আপনি বিশ বছর আগে মারা গেছেন?”
বৃদ্ধ এবার অরুণবাবুর দিকে তাকালেন।
— “মারা গেলে মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়।”
অরুণবাবু কিছু বলতে পারলেন না।
হরিপদ ধীরে বললেন,
— “আমাদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
— “তাহলে আপনারা কোথায় ছিলেন?”
বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকালেন।
— “এই ট্রেনেই।”
যে স্টেশনটা থাকার কথা নয়
কিছুক্ষণ পর ট্রেন থামল।
অরুণবাবু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন—
একটা স্টেশন।
নামফলকে লেখা—
নিশীথপুর।
তিনি হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন।
এটা কীভাবে সম্ভব?
তিনি তো নিশীথপুর থেকেই ট্রেনে উঠেছেন!
কিন্তু আরও অদ্ভুত ব্যাপার ছিল।
স্টেশনটা তাঁর চেনা নিশীথপুর নয়।
সবকিছু যেন পুরোনো।
ল্যাম্পপোস্ট।
টিকিটঘর।
বেঞ্চ।
এমনকি স্টেশনের ঘড়িটাও।
ঘড়িতে সময়—
১১টা ৪৫।
হরিপদ উঠে দাঁড়ালেন।
— “চলুন।”
— “কোথায়?”
— “আপনার গন্তব্য।”
অরুণবাবু নামতে গিয়েও থেমে গেলেন।
প্ল্যাটফর্মে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তাঁদের মধ্যে একজনকে দেখে তিনি চিনতে পারলেন—
হরিপদর সেই পুরোনো ছবির একজন মানুষ।
তারপর আরেকজন।
তারপর তৃতীয়জন।
দুর্ঘটনার রিপোর্টে যাদের নিখোঁজ বলা হয়েছিল।
তারা সবাই অরুণবাবুর দিকে তাকিয়ে আছে।
কেউ কথা বলছে না।
শুধু দূরে একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
অরুণবাবুর টিকিট
হরিপদ তাঁর হাতে একটা টিকিট দিলেন।
— “এটা রাখুন।”
অরুণবাবু টিকিটটা দেখলেন।
তাঁর নাম লেখা।
অরুণ চক্রবর্তী।
তারিখ—
আজ।
সময়—
১১:৪৫ PM।
গন্তব্য—
নিশীথপুর।
অরুণবাবু কাঁপা গলায় বললেন,
— “আমি তো নিশীথপুরেই আছি।”
হরিপদ কোনও উত্তর দিলেন না।
অরুণবাবু টিকিটটা উল্টে দেখলেন।
পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা—
“ফেরার যাত্রা নেই।”
তিনি মাথা তুললেন।
হরিপদ তখন আর সামনে নেই।
পরদিন
পরদিন সকালে স্টেশনের কর্মীরা অরুণবাবুকে খুঁজে পেলেন না।
অফিস খোলা।
চেয়ারটা খালি।
টেবিলের ওপর তাঁর চায়ের কাপ।
চা তখনও সামান্য গরম।
প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে পড়ে ছিল একটা কালো চামড়ার ব্যাগ।
পুলিশ এসে ব্যাগটা খুলল।
ভেতরে সেই পুরোনো পকেট ঘড়ি।
মরচে ধরা চাবি।
আর একটা কাগজ।
এবার লেখা—
“একজনের অপেক্ষা শেষ হয়েছে।”
কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি
পুলিশ স্টেশনের পুরোনো CCTV পরীক্ষা করল।
রাত ১১টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত সব স্বাভাবিক।
১১টা ৪৫-এ প্ল্যাটফর্মে হরিপদকে দেখা গেল।
তিনি একা বেঞ্চে বসে।
কয়েক সেকেন্ড পর অরুণবাবু এসে তাঁর পাশে বসলেন।
দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর একই কামরায় উঠে গেলেন।
ট্রেন চলে গেল।
CCTV-তে এরপর প্ল্যাটফর্মটা ফাঁকা।
কিন্তু প্রায় দশ সেকেন্ড পর—
ক্যামেরার একেবারে শেষ প্রান্তে একজন মানুষ এসে দাঁড়ালেন।
পুলিশ ছবিটা বড় করল।
লোকটা অরুণবাবু।
তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন।
কিন্তু তাঁর মুখে অদ্ভুত একটা হাসি।
তারপর তিনি হাত তুললেন।
ঠিক যেভাবে হরিপদ আগের রাতে অরুণবাবুকে ট্রেনে উঠতে ডাকছিলেন।
তারপর—
ফুটেজ বন্ধ।
নিশীথপুর স্টেশনের পুরোনো ঘড়িটা সেই রাতের পর আর ঠিক হয়নি।
কাঁটা আটকে আছে—
১১টা ৪৫ মিনিটে।
আর স্টেশনের নতুন স্টেশনমাস্টার বলেন, মাঝেমধ্যে রাত গভীর হলে প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চে একজন বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখা যায়।
ধূসর কোট।
কালো টুপি।
হাতে কালো ব্যাগ।
কখনও কখনও তাঁর পাশে আরেকজনকেও দেখা যায়।
দুজনেই চুপচাপ বসে থাকেন।
শেষ ট্রেন আসা পর্যন্ত।
আর ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে—
বৃদ্ধটি নাকি সবসময় নতুন স্টেশনমাস্টারের দিকে তাকিয়ে একটা প্রশ্ন করেন।
“আপনি কি জানেন, ট্রেনটা কোথায় যায়?”
কেউ এখনও উত্তর দিতে পারেনি।
কারণ যারা উত্তর দিতে গিয়েছিল—
তাদের কাউকে পরে আর নিশীথপুর স্টেশনে দেখা যায়নি।
Evidence















